সুন্দরবনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ, রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা!

খুলনা ব্যুরো॥ সুন্দরবন দেখতে কে না চায়। যেকারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় সুন্দরবনের লাগামহীন পর্যটক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিচ্ছে বন বিভাগ। তবে পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িতরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ না করে এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্তে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে তাও ভেস্তে যেতে পারে বলে মন্তব্য তাদের।
প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে একক বড় ম্যানগ্রোভ এই বনের প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণী দেখতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক দেশী বিদেশী পর্যটক আসে। বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণে করেছে ১ লাখ পর্যটক। পরবর্তী অর্থ বছরে বেড়ে সে সংখ্যা হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার। চলতি অর্থ বছরে এ সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলছে বন বিভাগ। ফলে দিন দিন বাড়তে থাকা এসব পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা ও কর্মকান্ড হুমকিতে পড়ছে বনের জীববৈচিত্র; এমন তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় সেন্টার ফর ইন্ট্রিগ্রেটেড স্টাডিজ অব সুন্দরবন ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে সুন্দরবনের ৭টি পর্যটন স্পটে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কোন কোন দিন ৪৫ হাজারের বেশী পর্যটক অবস্থান করেন। যেখানে এই সকল স্পটগুলিতে পরিবেশসম্মত ভাবে ৪ হাজার ২২০ জন থাকতে পারে। এরমধ্যে নীলকমল এলাকায় ১৪৬ জন, কচিখালিতে ২৫৯, কটকায় ২৯৬, হিরণ পয়েন্টে ৪৬৮, দুবলার চরে ৫৯১, কমর জলে ৯০৮ ও হারবাড়িয়া এলাকায় ১৫৫২ জন। গবেষণা পরিচালনাকারি দলের প্রধান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশন বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালমা বেগম জানান, সুন্দরবনে একটি জটিল ও সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম বিদ্যামান। পরিবেশের কোন কম্পোনেন্সের সামান্যতম তারতম্যে এই ইকোসিস্টেমে বিরুপ প্রভাব পড়ে। বর্তমানে সুন্দরবনে যে পর্যটন ব্যবস্থা চলছে তা কোন অবস্থাতেই পরিবেশসম্মত নয়। সালমা বেগম আরও জানান, এখন যে পরিমাণ পর্যটক সুন্দরবনে অনিয়ন্ত্রত ভাবে যাচ্ছে তারা যেখানে সেখানে খাবারের প্যাকেট, পলিথিন, পানির বোতলসহ বিভিন্ন বর্জ ফেলছেন। যা বনের প্রাণী ও মাইক্রো অর্গানিজিমমের ক্ষতি করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে যে সব স্পটে অধিক সংখ্যক পর্যটক যাচ্ছে সেখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ ক্ষতি করছে। সুন্দরবনকের পরিবেশ রক্ষায় তাই তারা বন বিভাগকে পর্যটন নিয়ন্ত্রনের সুপারিশ করেছেন। তবে ভিন্ন মত ট্যুর অপারেটরেটরদের। এবিষয়ে রূপান্তর ইকো ট্যুরিজিম লিঃ এর পরিচালক নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, এটি হলে সুন্দবনে পর্যটন শিল্প রক্ষার পাশিপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং সুন্দরবন রক্ষায় মানুষের আগ্রহও সৃষ্টি হবে। তাই যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সুন্দবনের ওপর নির্ভরশীল সকলের সাথে মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানান তারা। এ সম্পর্কে এক্সপে¬ার ট্যুরিজম কোম্পানি লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল আমিন লিটন জানান, দেশের অন্য পর্যটন এলাকা থেকে সুন্দরবন আলাদা। তাই এখানকার পর্যটন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও আলাদা হওয়া উচিত। পর্যটন স্পট না বড়িয়ে হঠাৎ করে পর্যটক নিয়ন্ত্রক করা হলে তা সুন্দরবন কেন্দ্রীক পর্যটন শিল্পের জন্য সুখকর হবে না। বিশাল আয়তনের এই সুন্দরবকে ৭টি পর্যটন স্পটের মধ্যে সীমাবদ্ধা না করে আরও স্পট তৈরী করলে এক স্থানে পর্যটকদের চাপ পড়বে না। এছাড়া সারা বছর সুন্দরবনে পর্যটক আসে না। এখানে পর্যটন মৌসুম থাকে মাত্র ছয় মাস। তাই এমন সিদ্ধান্ত হলে দেশী পর্যটক সুন্দরবন দেখা থেকে বঞ্চিত হবে আর বিদেশীরা আগ্রহ হারাবে। এমনকি দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে তাও ভেস্তে যেতে পারে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগীয় কর্মকর্তা সাইদ আলী জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষায় পর্যটক নিয়ন্ত্রন ও ২০১৪ সালে প্রণীত সুন্দরবন ভ্রমন নীতিমালা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এ নীতিমালায় ১৭ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নের সময় সুন্দরবন নির্ভর বিভিন্ন গ্রুপের সাথে বৈঠকও হয়েছিল। সুন্দরবন জাতীয় সম্পদ তাই এখান থেকে রাজস্ব আদায়ের চেয়ে বনকে রক্ষার ওপর বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত।

শেয়ার