কালীগঞ্জের ৫ নারী পেলেন শ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা

নয়ন খন্দকার, কালীগঞ্জ ॥ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ৫ নারীকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৬ উপলক্ষে সোমবার সকালে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ হলরুমে “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এমফ ৫ নারীকে সম্মাননা হিসেবে ক্রেষ্ট ও  সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এছাড়া তাদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত ও গলায় পরিয়ে দেয়া হয় চাদর।
জীবন সংগ্রামে অনেক বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে এবং প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে মায়া দেবনাথ, সফল জননী নারী হিসেবে মোছাঃ আনোয়ারা বেগম, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে লিলি খাতুন, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় সালেহা বেগম ও নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যেমে জীবন শুরু করা নারী হিসেবে হুরজাহান বেগমকে জয়িতা সম্মাননা দেয়া হয়। এ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভায় অনুষ্ঠিত হয়। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছাদেকুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, ঝিনাইদহ-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল আজীম আনার। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম জাহাঙ্গীর সিদ্দিক ঠান্ডু। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইলিয়াস রহমান মিঠু, রাখালগাছি ইউপি চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম মন্টু, সোনার বাংলা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবুপদ বিশ্বাস, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খোন্দকার শরিফ আক্তার, সাংবাদিক নয়ন খন্দকার, এনামূল হক সিদ্দিক, জয়িতা নারী হুরজাহান বেগম প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আইনাল হক।

জয়িতা সম্মানতা পাওয়া নারীদের কথা

মায়া দেবনাথ : অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জকারী মায়া দেবনাথ কালীগঞ্জ কলেজ পাড়ার দর্জি মায়া নামে পরিচিতি। ১৯৬৮ সালে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। ছোট বেলায়ই মারা যান বাবা। তিন ভাইবোন ও মা মিলে অভাব ছিল নিত্য সঙ্গী। একটু বড় হলেই ভায়েরা তাকে বিয়ে দেয়ভ হয় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পবহাটি গ্রামে। স্বামীর প্রথম পক্ষের মৃত স্ত্রীর ২টি শিশুর সঙ্গে তার সময় কাটতে থাকে। এখানেও অভাব হয় তার সঙ্গী। ১৮ মাস সংসার করার পর ৯ মাসের গর্ভাবস্থায় সেখান থেকে ভাইয়ের সংসারে চলে আসে মায়া। মেয়ে ও মা ভাইয়ের সংসারে বোঝা হয়ে উঠে। শখ-আহ্লাদ তো দুরের কথা মেয়ের খাবার যোগাড় করতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠান থেকে দর্জি বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। কিছু দিন ধরে  একটি দোকানে কাজ করেন। পরে ধীরে ধীরে তিনিই একটি দোকান করে ফেলেন। এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি সাফল্য পেতে শুরু করেন। মেয়ে জামাই ও নাতনিকে নিয়ে তিনি এখন সেখানেই বসবাস করছেন।
আনোয়ারা বেগম ঃ সন্তানের খুশিতে মায়ের খুশি, এমনটাই মনে করেন সফল জননী আনোয়ারা বেগম। ১৯৬২ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার দাপনা গ্রামে জন্ম হয় তার। পিতা লুৎফর রহমান, মা, সুফিয়া খাতুন ১৩ বছরে বিয়ে দেন তার। এরপর সন্তান ও সংসারই তার একমাত্র ভাবনা। ভ্যান চালক স্বামীর সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হতো। সন্তানদের লেখাপড়া করানো ছিল দুঃসাধ্য। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার আগ্রহ দেখে তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করেন। হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন ও কাঁথা সেলাইয়ের আয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া অব্যাহত রাখেন। আনোয়ারার হাড় ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে এসএসসি ও এইচ এসসি পর্যায়ে লেখাপাড়ায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন পুত্র মিলন। ছেলের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে তিনি ছেলেকে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ান। মা ও ছেলে স্বপ্ন পূরণ হয়। আরেক সন্তান ঝুমুরাও বর্তমানে ঝিনাইদহ কেসি কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের অধ্যয়তরত। এক পর্যায়ে উপার্জনক্ষম আনোয়ারার স্বামী কিছুদিন পূর্বে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর আর্থিক অবস্থা খুবই রাখাপ পর্যায়ে পৌছায়। এরই মধ্যে খবর আসে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাশ করা আনোয়ারার আশা-আকাংখার প্রতিক ছেলে মিলন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চুড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। একদা ল্যাম্প জ্বালিয়ে হাতপাখার বাতাস দিয়ে যাকে তিনি বড় করেছেন সেই সন্তান তার মান রেখেছে। দুঃখের দিন শেষ হতে চলেছে আনোয়ারার। সফল জননী হিসেবে বর্তমানে তিনি এলাকায় গর্বিত।
লিলি খাতুন:  শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন লিলি খাতুন। ১৯৮৬ সালে কোলা গ্রামের আব্দুস সামাদ মন্ডল ও মা সুফিয়া বেগমের ঘরে জন্ম নেন তিনি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক লিলির পিতা পূর্ব থেকেই প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ছিলেন। স্কুলের চাকুরি হারিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালাতেন তিনি। পিতার প্রবল শিক্ষানুরাগের ফলে লিলি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। চরম আর্থিক সমস্যার মধ্যে সমপর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন তিনি। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েও  শারীরীক অসামর্থের কারনে লিলির পিতা নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। সেই স্বপ্ন একদিন লিলির মধ্যে দিয়ে পূরণ হবে-বাবার এ আকাংখাই ছিল লিলির একমাত্র স্বপ্ন। এসএসপি পাসের পর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম হয় তার। তখন কলেজের শিক্ষকবৃন্দ তাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন জনের সহায়তায় অবশেষে স্থানীয় কলেজ থেকে বিএ পাস করেন লিলি। বিএ পড়াকালীন লিলি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। শিক্ষকতা চাকুরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে কর্মরত রয়েছেন। স্বামীর সহযোগিতায় শিক্ষকতার পাশাপাশি যশোর এমএম কলেজ হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করছেন। দুরপাড়াগায়ে বসবাস করেও শিক্ষার প্রতি অদম্য অনুরাগই তাকে এই পথ চলতে সহায়তা করেছে।
হুরজাহান বেগম:  কালীগঞ্জ উপজেলার নগরচাপরাইল গ্রামে মোহাম্মদ আলীর ঘরে ১৯৭৭ সালে জন্ম অপরুপ এক কন্যা সন্তানের নাম হুরজাহান বেগম। দরিদ্র পিতার সংসারে চায়ের দোকানদারী করতেন হুরজাহান। কখনো স্কুলে যাওয়ার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। মাত্র ১২ বছরে বিয়ে হয়ে যায় তারা। দরিদ্র স্বামীর নিত্যদিনের অত্যাচার হুরজাহানের সৌন্দর্য্যকে ম্লান করে দিতে থাকে। স্বামীর কাছে কিছু চাইলেই জোটে কেবল অত্যাচার আর নির্যাতন। অবশেষে স্বামীর দেয়া অপবাদ আর তালাক মাথায় নিয়ে হুরজাহানের ঠাঁই হয় মানুষের দয়ার দুয়ারে। সৃষ্টিকর্তার দেয়া সৌন্দর্য্য বিভীষিকা হয়ে উঠে। তার অসহায়ত্বের সুযোগ ভিটা-মাটি সবকিছু লুটপাট হয়ে যায়। কিন্তু হুরজাহান দমে থাকেনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের মানুষ করতে থাকেন। একটি সেলাই মেশিন কেনেন। বাবার বাড়িতে কোন রকম মাথা গোজার ঠাঁই তৈরি করেন। নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়কারী মহিলা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন। এলাকার নির্যাতিত নিপিড়ীত নারীরা তার এই সংগ্রাম থেকে নতুন করে বাঁচার উদ্দীপনা পাচ্ছেন।
সালেহা বেগম:  সালেহা বেগম ১৯৫৯ সালে কালীগঞ্জ পৌরসভার ফয়লা গ্রামের পিতা আইজদ্দিন বিশ্বাস ও মাতা হালিমা বেগমের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মাগুরা জেলার সহকারি শিক্ষা অফিসার সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয় সালেহার। শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন তিনি স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি মাত্র ১৮ মাসের সংসার জীবন থেকে ৬ মাসের মেয়ে বিতাড়িত হন। বাবার সহযোগিতায় মানষিক ভারসামহীনতা কাটিয়ে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সালেহা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবার জন্য পথচলা শুরু করেন। পশু চিকিৎসা, দর্জি বিজ্ঞান, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন নেন। এরপর দর্জি বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে এলাকার আরো কিছু মেয়েকে নিয়ে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের রেজিষ্ট্রেশন করে গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতি। এভাবেই সমাজ সেবা মূলক কাজে হতাখড়ি হয় সালেহার। সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখিন হন। নারীদের এসব সমস্যা দুর কারার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে সালেহা আরো বেশি জড়িয়ে পড়েন। সমিতির সদস্যদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পানি ব্যবস্থাপনা, বনায়ন ইত্যাদি আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার মধ্যে দিয়ে তিনি এলাকায় সমাজসেবি পরিচয় লাভ করেন। বে-সরকারি এনজিও সিসিডিবি’র অর্থায়নে স্কুল প্রোগ্রাম, স্যানিটেশন, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি কাজের সঙ্গে জীবন কাটাতে থাকেন। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, যৌতুক, বহু বিবাহের মত সামাজিক সমস্যা দুরীকরণে সালেহা বেগম ওই এলাকায় প্রতিকৃৎ এর ভুমিকা পালন করেছেন।

শেয়ার