হানাদার বাহিনীর পাবশিক নির্যাতনের চিহ্ন সারা শরীরে ৪৫ বছরেও বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি মনিরামপুরের দুর্গা

মোতাহার হোসেন, মনিরামপুর॥ মুক্তিযুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। কাকডাকা ভোরে অসুস্থ্য শরীরে রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ান দুর্গা রাণী। পরম তৃপ্তির সাথে খেয়ে মুক্তিযোদ্ধারাও বিদায় নেন। তারপরই হানাদার বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বাড়িতে কাউকে না পেয়ে গৃহবধূ দূর্গারানী সরকারকে ধরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায় হানাদার বাহিনীর কয়েকজন। কথাগুলো বলছিলেন আর শাড়ির আচলে বার বার চোখ মুছছিলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ডুমুরখালি গ্রামের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় পাশবিক নির্যাতনের শিকার দূর্গারানী সরকার।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় অসুস্থ্য শরীরে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার রান্না করেছেন তিনি। তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে হানাদার বাহিনী। তারপরও তিনি আজও বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি-আক্ষেপ করে বলেন দূর্গারানী সরকার। অথচ এখনো তার সারা শরীরজুড়ে রয়েছে নির্যাতনের চিহ্ন।
উপজেলার ডুমুরখালি গ্রামে গিয়ে কথা হয় দূর্গারানী সরকারের সাথে। তিনি একটি মাটির দেয়াল আর চটার (বাঁশ) বেড়া ঘেরা বাড়িতে একা বসবাস করেন তিনি। ছেলে সন্তান নেই তার। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তারা শ্বশুর বাড়িতেই থাকেন। সময় পেলে মাঝে মাঝে মায়ের বাড়িতে আসেন তারা। দূর্গারানীর স্বামী নিমাই সরকারও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার ভাতা দিয়েই চলে তার সংসার। গেল বছর তিনি পরলোক গমন করেন। এসময় তিনি বলেন, তার ওপর যে পাশবিক নির্যাতন হয়েছে তা দেশবাসি জানুক। স্বামী মুক্তিযোদ্ধার সুবাদে তার বাড়িতেই চলতো মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়া-দাওয়া। তাদের জন্য ভোর বেলা রান্না করতেন দূর্গারানী। একদিন ভোরবেলা রান্না করে মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে চলে যাবার কিছুক্ষণ পরেই হানাদার বাহিনী তার বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এসময় বাড়িতে কাউকে না পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। তখন তিনি ৮ মাসের অন্ত:স্বত্ত্বা। হানাদার বাহিনী তার ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। বাড়িতে থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাবার সময় গ্রামবাসীর অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেয় হানাদার বাহিনী। এর কিছুদিন পরই মৃত পুত্র সন্তান প্রসব করেন দূর্গারানী সরকার। মাস খানেক পরেই দেশ স্বাধীন হয়। মুক্তিযোদ্ধা স্বামী নিমাই সরকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ জন্য দূর্গারানীকে কখনো বাকা চোখে দেখেননি। বরং চরম সম্মান আর পরম ভালবাসা দিয়ে দূর্গারানীকে আগলে রাখতেন তিনি, জানান দূর্গারানী। মুক্তিযুদ্ধে তার ত্যাগ ও সম্ভ্রমহানীর স্বীকৃতি স্বরুপ আজও তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়নি বলে তিনি আক্ষেপ করেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সাবেক চেয়ারম্যান হাতেম আলী বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য কয়েকবার আবেদন করেও কোন ফল পাওয়া যায়নি। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সময় এই ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। দেশ স্বাধীনে দূর্গারানীর যে আত্মত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এমএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তাকে কেউ জানায়নি। স্থানীয়রা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেয়ার