আজ বিভিন্ন জেলা উপজেলায় পালিত হবে পাক হানাদার মুক্ত দিবস

সমাজের কথা ডেস্ক ॥ আজ ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা এই দিনটিতে বৃহত্তর যশোরের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পাক হানাদারমুক্ত হয়। আকাশে ওড়ে লাল সবুজের স্বাধীন পতাকা। মুক্তিকামী মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েন। মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয় এ অঞ্চল। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে নানা কর্মসুচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
ঝিকরগাছা  থেকে কামারুজ্জামান কামাল জানান, ১৯৭১ সালের এইদিনে ঝিকরগাছা থেকে পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে গেলে দিনটি স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে “ঝিকরগাছা হানাদার মুক্ত দিবস” বা “ঝিকরগাছা মুক্ত দিবস” হিসাবে স্থান পায়। সেই থেকে দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও যথাযথ মর্যদার সাথে পালিত হয়ে আসছে।
চৌগাছা থেকে ইয়াকুব আলী জানান, ৬ ডিসেম্বর যশোরের চৌগাছা হানাদার মুক্ত হয়। ইতিহাস বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য মতে এ দিনটিই চৌগাছা হানাদার মুক্ত দিবস।
এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৮জন শহীদের নাম ঠিকানা ও কবর স্থানের সন্ধান মিলেছে। তারা হলেন  জয়নাল আবেদীন (যাত্রাপুর) মোজাহার আলী, (চন্দ্রপাড়া) খাইরুল ইসলাম (কোটালীপাড়া) নুরুল ইসলাম (আফরা), সুজাউদ্দৌলা, (জগন্নাথপুর), গোলাম কবির (রামকৃষ্ণপুর), সিরাজুল ইসলাম, (উজিরপুর), মনির হোসেন। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর চৌগাছা শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্বাধীনতার স্মৃতি স্মারক ভাস্কর্য ’দুর্জয় দুর্গ’ নির্মাণ করা হয়। এই ভাস্কর্যটির নির্মাণ শিল্পী আতিয়ার রহমান। ১৯৬১ সালে স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গঠনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তারপুর গ্রামে এলে তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ওই গ্রামে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি স্তম্ভ স্থাপন করা হয়।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে নয়ন খন্দকার জানান, ১৯৭১ সালের ৬ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় ঝিনাইদহ। আকাশে ওড়ে লাল সবুজের স্বাধীন পতাকা। ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মকবুল হোসেন জানান, ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভারী অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝিনাইদহ দখলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসতে থাকলে বিষয়খালী ব্রিজের এপার থেকে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাধা দেন। প্রায় তিন ঘণ্টা যুদ্ধের পর তারা পিঁছু হঠে যায়। ১৬ এপ্রিল হানাদার বাহিনী আবারো বিষয়খালী বেগবতী নদীর তীরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল বাধার মুখে পড়ে। এখানে প্রায় ৬ ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধ হয়।
এই যুদ্ধে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ব্রিজের পাশেই তাদের গণকবর দেওয়া হয়। এ থেকেই জেলায় ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধ। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের মধ্যে ছিল বিষয়খালী যুদ্ধ, গাড়াগঞ্জ যুদ্ধ, শৈলকুপা থানা আক্রমণ, কামান্না, আলফাপুর ও আবাইপুরের যুদ্ধ। ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ১৬ এপ্রিল বিষয়খালী যুদ্ধে ৩৫ জন, ১৪ অক্টোবর আবাইপুর যুদ্ধে ৪১ জন, ২৬ নভেম্বর কামান্না যুদ্ধে ২৭ জনসহ ঝিনাইদহ জেলায় ২৭৬ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদের মধ্যে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে দুই জন। তাঁরা হলেন- বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ও বীর প্রতীক সিরাজুল ইসলাম।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের  অনেককে বিভিন্ন স্থানে গণকবর দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের নাম ঠিকানা আজও মেলেনি।  ৬ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ জেলা শহর শত্রু মুক্ত হয়। এর আগে ৩ ডিসেম্বর মহেশপুর, ৪ ডিসেম্বর কোটচাঁদপুর, ৫ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ এবং সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর শৈলকুপা উপজেলা শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঝিনাইদহ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর জেলা কমান্ডার আমির হোসেন মালিতা জানান, মিত্র বাহিনী ঝিনাইদহের হলিধানী বাজারে খবর নিতে আসেন। মিত্র বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল বাহেলে ও লে. কর্নেল পিকে দাস গুপ্ত। ঝিনাইদহের ইউনিট কমান্ডার হিসেবে তিনিসহ ইউনিয়ন কমান্ডার রজব আলী, বাকুয়া গ্রামের মরহুম মনিরুল ইসলাম, নারিকেল বাড়িয়ার বুলু মিয়া, গাবলা গ্রামের মকছেদ আলীসহ অনেকে মিত্র বাহিনীকে স্বাগত জানায়। ৫ ডিসেম্বর বিকালে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ঝিনাইদহ শহরের চারি পাশে অবস্থান নেন। গোলা বর্ষন করতে থাকে পাক সেনা অবস্থানের উপর। ৬ ডিসেম্বর সকালে পাকসেনারা ঘাঁটি ছেড়ে মাগুরার দিকে পালিয়ে যায়। অনেক পাক সেনা বন্দী হয়। ঝিনাইদহ হানাদার মুক্ত হয়। হাজার হাজার মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাস করতে থাকে।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) থেকে আব্দুর রহমান জানান, ৬ ডিসেম্বর, ‘কলারোয়া হানাদার মুক্ত হয়। সেই থেকে দিনটিকে মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হয়। একাত্তরের আগুনঝরা এই দিনে কলারোয়া এলাকা পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। কলারোয়ার আকাশে ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিকামী মানুষের উল্লাসে মুখরিত হয় পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষত-বিক্ষত কলারোয়া। গৌরবোজ্জ্বল এদিনটি এবারও পালিত হচ্ছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। সূত্রমতে, মহান মুক্তিযুদ্ধে কলারোয়ার ৩৪৩ জন বীরসন্তান অংশ নেন। এরমধ্যে শহিদ হন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। কলারোয়া এলাকায় পাক-বাহিনীর আক্রমণে সর্বপ্রথমে শহিদ হন মাহমুদপুর গ্রামের আফছার সরদার। দিবসটি  যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনব্যাপি বিভিন্ন কর্মসূূূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূূূচির মধ্যে রয়েছে: প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা, সকাল ৭ টায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, ৭.৩০ মিনিটে গণকবর ও স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ, সকাল ৮ টায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পতাকা উত্তোলন,  সকাল ১০ টায় একাত্তরের বেশে মুক্তিযোদ্ধা-জনতার বিজয় র‌্যালি, বেলা ১১ টায় হাইস্কুল ফটবল ময়দানে আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া যোহর নামাজ শেষে মহান মুুক্তিযুদ্ধে শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হবে।

শেয়ার