জাল ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসা বছরে সাড়ে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে নয়া কৌশলে এগুচ্ছে কেসিসি

খুলনা ব্যুরো ॥ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) ট্রেড লাইসেন্স জাল করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন নগরীর প্রায় ২০ হাজার ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী কোনো ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার অনেকে একবার লাইসেন্স করেই আজীবনের জন্য খালাস ! নবায়ন করার কোনো প্রয়োজন মনে করেন না। ফলে লাইসেন্সবিহীন ও জাল ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে নির্বিঘেœ ব্যবসা করায় কেসিসির বছরে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার রাজস্ব লোকসান হচ্ছে। খোদ কেসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানেন। কেসিসির পক্ষ থেকে একাধিকবার জাল ট্রেড লাইসেন্স চক্রটি ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কেসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, ট্রেড লাইসেন্স জরিপ হওয়ার পর সব ব্যবসায়ীকে ট্রেড লাইসেন্স করতে বাধ্য করা হবে।
বর্তমানে নগরজুড়ে প্রায় অর্ধলাখ ব্যবসায়ী থাকলেও মাত্র ৪০ ভাগ ব্যবসায়ীর রয়েছে ট্রেড লাইসেন্স। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কেসিসির আওতাধীন ২১ হাজার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ৪ কোটি ৫৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। জাল ট্রেড লাইসেন্স প্রতিরোধ করতে ২০১৭ সাল থেকে ব্যবসায়ীদের অত্যাধুনিক লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেসিসি কর্তৃপক্ষ। ট্রেড লাইসেন্সের নকশা পুরোপুরি পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করছে তারা। সম্প্রতি জাল ট্রেড লাইসেন্স বন্ধ করার লক্ষ্যে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে রাস্তাওয়ারি দোকান শুমারি রেজিস্ট্রারের জরিপ শুরু করেছে কেসিসি। মঙ্গলবার পর্যন্ত নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে রাস্তাওয়ারি দোকান শুমারি রেজিস্ট্রারের তালিকায় ৩৪ হাজার প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাকি রয়েছে ২১নং ওয়ার্ডের জরিপ। সবমিলিয়ে নগরীতে প্রায় ৪০ হাজার ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া যাবে বলে কেসিসির একটি সূত্র ধারণা করছেন। সূত্রটি জানান, সঠিকভাবে শেষ পর্যন্ত সব প্রতিষ্ঠানকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনা হলে বছরে ১০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কেসিসির সূত্রটি আরও জানান, জাল ট্রেড লাইসেন্স প্রতিরোধে ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত মেয়র আনিসুর রহমান বিশ্বাস সাত ধরনের ট্রেড লাইসেন্সের পেপারের মধ্যে ১টি শনাক্ত করেছেন। বর্তমান চলমান ট্রেড লাইসেন্সের লোগো ছাড়া সবকিছুই পরিবর্তন হবে। নয়া ট্রেড লাইসেন্সে থাকবে ইংরেজি ভার্সন। থাকবে চার ধরনের অ্যাম্বুস। যার দুটি চীন থেকে করানো হবে। ট্রেড লাইসেন্সের মূল কাগজটি আনা হবে ফ্রান্স থেকে। ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের দেয়া হবে স্মার্টকার্ড। যার মধ্যে থাকবে এক ধরনের বিশেষ চিপ (মোবাইলের সিমের মতো)। ব্যবসায়ীদের সব তথ্য স্মার্টকার্ডটিতে থাকবে। এটা ব্যবসায়ীদের একটি পরিচয়পত্রের মতো কাজ করবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ৫ বছরের অগ্রিম ট্রেড লাইসেন্স ফি জমা দেয়ার সুযোগ থাকবে। সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয় হল ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে ব্যবসায়ীকে নবায়নের জন্য আগাম বার্তা দেয়া হবে।
কেসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নাজমুল হাসান জানান, ২০১৭ সাল থেকে ব্যবসায়ীদের ইংরেজি ভার্সনে ফ্রান্সের কাগজে করা ট্রেড লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেসিসির ৩৩ জন কর্মকর্তা ট্রেড লাইসেন্স জরিপ করছেন। জানুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে নতুন ট্রেড লাইসেন্স বই দেয়া হবে। এরপর মার্চ-জুন মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীদের মাঝে স্মার্টকার্ড বিতরণের কার্যক্রম শুরু হবে। এর জন্য খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজসহ সব ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, জাল ট্রেড লাইসেন্স প্রতিরোধে নগরীর কেসিসি মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। তারা অনেক চতুর। ট্রেড লাইসেন্স জরিপ হওয়ার পর সব ব্যবসায়ীকে ট্রেড লাইসেন্স করতে বাধ্য করা হবে। যার ফলে জাল ট্রেড লাইসেন্সের পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে কেসিসির রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যাবে। স্মার্টকার্ডের বিষয়ে খুলনার ৫ হাজার ব্যবসায়ীকে পরীক্ষামূলক কার্ডটি দেয়া হবে।

শেয়ার