যশোরে সন্ত্রাস দমনে পুলিশের ‘কঠোর অবস্থান’ ‘সাড়া’ ফেলতে পারেনি

jesসীমান্ত রহমান:  যশোরে সন্ত্রাস দমনে পুলিশের ‘কঠোর অবস্থান’ ‘সাড়া’ ফেলতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দেওয়া পুলিশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এমনটিই মনে করছেন শহরের বিশিষ্টজন। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে পুলিশ ওই সব ঘটনাকে ‘নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে’ এমনটি হয়েছে বলে দাবি করছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি ‘পুলিশই ধরে নিয়ে’ গুলি করছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের সফলতা নিয়ে যেমন বিতর্ক রয়েছে, তেমনি দাগি আসামি আটক না করায় রয়েছে নানা প্রশ্ন।
নানা সমৃদ্ধির যশোর জেলাটিতে সন্ত্রাস ও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জের ধরে এখানে বছরজুড়েই বিরাজ করে অস্বস্তি-অশান্তি। শুধু তাই নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সম্প্রতি বছরে খুন হয়েছেন শান্তিশৃংখলা কমিটির নেতা ও শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আব্দুল মান্নান, শহরের এক নাম্বার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম, সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনসহ অনেক নেতা। এ অবস্থায় যশোরের পুলিশ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সন্ত্রাস দমনের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেই ঘোষণা কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে শহরের নাগরিক সমাজের মধ্যে সেসব আলোচনা প্রায়ই শোনা যায়।
শহরবাসীর ভাষ্য, যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকায় নামে নামে উঠতি বয়সী সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বাহিনী। সন্ত্রাসীরা মাদক সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, খুন, ডাকাতি, ছিনতাইসহ এলাকায় রামরাজত্ব কায়েম করে চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের দমাতে গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা তুলনায় নগণ্য। তবে প্রায়ই কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা গোলাগুলিতে মারা পড়ছে কেউ কেউ। একাধিক সূত্র মতে, সন্ত্রাসীদের অপঘাতে মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া অস্ত্র চলে যাচ্ছে তাদেরই সহযোগীদের হাতে। এর মাধ্যমে জন্ম হচ্ছে নতুন আরেকটি গ্রুপ বা বাহিনী। তারা টেন্ডারবাজি, খুন-খারাবি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। জিম্মি করছে শহরবাসীকে।
স্থানীয়রা জানায়, শহরের ষষ্ঠিতলাপাড়া এলাকার মাহবুব আলম ওরফে ম্যানসেল ও শিশির ঘোষের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি বাহিনী। অভিযোগ রয়েছে তারা সশস্ত্র অবস্থায় চলাচল করে। শহরের শংকরপুর পশু হাসপাতাল এলাকায় রয়েছে আরো দুটি গ্রুপ। একটির নেতৃত্ব দেন রাকিব ওরফে ভাইপো রাকিব। তার প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতা। ঠিক একইভাবে শহরের বেজপাড়া মেইন রোড এলাকায় দাপটের সঙ্গে চলেন তুষ্ট, সাদেক দারোগা মোড় এলাকায় সুমন, চোপদারপাড়া এলাকায় ইয়াসিন, ঘোপ জেল রোড এলাকায় নয়ন, একই এলাকার ফারাজি, বেজপাড়ায় খালেক, শংকরপুর এলাকায় নয়ন, ঘোপ এলাকার সজল, খড়কী পশ্চিমপাড়ার রমজান, খড়কী কবরস্থান এলাকার কাশেম। ইতোপূর্বে তারা কোন না কোন গ্রুপের সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের বাহিনীর প্রধানরা ‘বন্দুকযুদ্ধ, গণপিটুনি কিংবা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে’ মারা গেলে নিজেরাই বাহিনীর প্রধান বনে গেছেন।
ম্যানসেল বাহিনীর অপর এক সন্ত্রাসী রয়েছে একই এলাকার আব্দুল খালেকের ছেলে মনিরুল ইসলাম। যশোরের ইতিহাসে এটাই প্রথম যে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে সরকারি এমএম কলেজের শহীদ মিনারে সাধারণ মানুষদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করার জন্য বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং গুলি করে পুরো অনুষ্ঠানটিকেই লন্ডভন্ড করে দেয়। এঘটনার ছবি পত্রিকায় প্রকাশ হলেও যেন কোন মাথাব্যাথা নেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর। ফলে পার পেয়ে যাচ্ছে ওই সকল চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা।
ইতিপূর্বে ডাকাতির চেষ্টাকালে গণপিটুনিতে খুন হন ম্যানসেল বাহিনীর তৎকালিন সেকেন্ড ইন কমান্ড ডলার। একই পথ অনুসরণ করেন তার অপর সহযোগি নজু ডাকাত। কিন্তু বহাল তবিয়তে রয়েছে সেই বাহিনী প্রধান ম্যানসেল ও তার বর্তমান সেকেন্ড ইন কমান্ড শিশির ঘোষ। ফলে এত কিছুর পরেও ওই সকল অপরাধীরা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে নানা ধরনের আতংক।
এদিকে ‘সন্ত্রাসী বাহিনীর গোলাগুলি’তে এক সপ্তাহের মধ্যে হাফিজুর রহমান ও জাহাঙ্গীর হোসেন খুন হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। আবার উল্লিখিত সন্ত্রাসীরাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে পুলিশের ‘কঠোর অবস্থান’ শুধুই ফাঁকা আওয়াজ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিকরা।
এব্যাপারে জানতে চাইলে যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী গোলাগুলি করে সন্ত্রাসী মারা  গেলেও জনগণ যদি স্বস্তি পায় সেটাই পুলিশের সাফল্য।

শেয়ার