যশোরে কালবৈশাখীর তা-বনৃত্যে ৫ জনের মৃত্যু ॥ লণ্ডভণ্ড- ঘরবাড়ি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, আহত অর্ধশতাধিক

jhor
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ চৈত্রের শেষেই কালবৈশাখীর তাণ্ডবনৃত্য দেখলো যশোরবাসী। মঙ্গলবার রাতেই কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে জেলায় জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের সময় বিভিন্ন এলাকায় ঘর চাপা পড়ে ও আতঙ্কে অন্তত ৫ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া গাছপালা ভেঙ্গে বাড়ি ঘরের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ও খুঁটি উপড়ে পড়ায় ঝড়ের রাতে গোটা জেলায় বিদ্যুতবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বুধবার বিকেল পর্যন্ত কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হলেও অনেক এলাকা এখনও বিদ্যুতহীন হয়ে রয়েছে। গাছ ভেঙ্গে পড়ার কারণে রাতে যশোর-খুলনা ও যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে যান চলাচলও বন্ধ ছিল কয়েক ঘণ্টা।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে হঠাৎ করে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। এর সাথে শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। প্রায় এক ঘণ্টা ঝড় ও বৃষ্টির দাপটে বিধ্বস্ত হয়েছে জেলার অনেক এলাকা। ঝড়ে বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গেছে। বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
যশোর জেলা ত্রাণ অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতের ঝড়ে যশোর জেলার সদর, ঝিকরগাছা, চৌগাছা, মণিরামপুর ও অভয়নগর এই ৫ উপজেলার উপর দিয়ে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। এতে প্রাথমিকভাবে ৩ জনের মৃত্যুর খবর তারা পেয়েছেন। এরা হলেন, অভয়নগর উপজেলার ধুলগ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মিকান্ত (৪০) ও একতারপুর গ্রামের সাহিদা বেগম (৭০) এবং সদর উপজেলার হালসা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হামিদ (৮০)। ঝড়ের সময় ঘর চাপা পড়ে এদের মৃত্যু হয়েছে বলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস জানিয়েছে। এছাড়া ঝড়ের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আরও দু’নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরা হলেন, শহরের চোরমারা দীঘিরপাড় এলাকার গৃহবধূ পারভীনা (৩৫) ও উপশহর এলাকার গৃহবধূ জামেলা (৪০)। ঝড়ের সময় ঘরের চাল উড়ে যাওয়ায় ও গাছ ভেঙ্গে পড়তে দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, ঝড়ে শহরের নাজিরশংকরপুর এলাকায় নির্মাণাধীন হাইটেক সফটওয়্যার পার্কের ক্রেন হেলে শ্রমিকদের অস্থায়ী ঘরে পড়ে। এতে ঘর ভেঙ্গে পড়ে ৮ শ্রমিক আহত হন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন। অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নে মসজিদ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১৭টি দোকান ঘরের উপর গাছ ভেঙে পড়ে ২ শিশুসহ ৫জন আহত হন। শুভরাড়া ইউনিয়নে নদীর পাড়ে ১৩টি অস্থায়ী দোকান, দীঘিরপাড়ে মেলার ৩০টি দোকান ঘর ঝড়ের তান্ডবে তছনছ হয়ে যায়। এতে অন্তত ৮ জন আহত হন। সুন্দলী ও প্রেমবাগ ইউনিয়নে ১৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় যশোর-খুলনা মহাসড়কে ৬টি বড় গাছ ভেঙে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ ছিল প্রায় ৪ ঘন্টা। অভয়নগরে আহতরা স্থানীয় ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে। আর যশোর সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঝড়ে আহত হয়ে ২০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে। যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশাপাশি যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের মালঞ্চিতেও একটি গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। এ কারণে এ মহাসড়কে প্রায় ৬ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে তারা জানতে পেরেছেন কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার ৪০ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আম ৬৫৪ হেক্টর, কলাবাগান ২৬৭ হেক্টর, পেঁপে ১৫৮ হেক্টর, সবজি ৯৫৫ হেক্টর ও লিচু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫২ হেক্টর জমির। মাঠের সব তথ্য পেলে এ পরিমাণ বাড়তে পারে।
ঝড়ের পরদিন বুধবার যশোর সদরের সুজলপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, পাকা বোরো ধান মাটির সাথে হেলে পড়েছে। অনেক জমিতে কেটে রাখা ধানে পানি জমেছে। কৃষক আবদুর রহিম সরদার ও তার স্ত্রী মিলে ক্ষেত থেকে সেই ধান সরিয়ে শুকনা স্থানে রাখছেন। পাশের গ্রাম সুজলপুর-পতেঙ্গালি গিয়ে দেখা গেছে কালবৈশাখীর তাণ্ডবের চিত্র। এ গ্রামের অধিকাংশ টিনের ঘরের চাল উড়ে গেছে। ভিজে গেছে ঘরের মালামাল ও বই খাতা। এ গ্রামের কলেজছাত্রী কেয়া খাতুনকে তার ভিজে যাওয়া বই শুকাতে দেখা যায়। এই গ্রামের মাঠে সাখাওয়াত মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন তার বিধ্বস্ত কলাবাগান। ঝড়ে তার ক্ষেতের সব কলাগাছ ভেঙ্গে গেছে। এভাবে যশোরের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অপরদিকে, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের জগহাটি গ্রামের কামাল উদ্দিন, তোরাব মোল্যা, লতিফ মল্লিক, আশরাফ মল্লিক, ওহাব মল্লিকসহ বিভিন্ন লোকের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গেছে। টিনের ছাউনি উড়ে গেছে। জগহাটি পাড়–ই পাড়ার অধিকাংশ কাঁচাঘর ভেঙ্গে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারা বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে রয়েছে। আমবটতলা বাজারের শফিয়ারের ফার্নিচারের দোকানের টিন উড়ে গেছে। এখানকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের টিনও উড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেয়াড়া ইউনিয়নের চান্দুটিয়া গ্রামের বজলুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, ইউসুফ গাজী, আনোয়ার হোসেন বুলবুলসহ অনেকের ঘরবাড়ির টিন এবং চান্দুটিয়া মঈনুল ইসলাম দাখিল মাদ্রাসার টিন উড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মালামাল। তবে এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনও কোন ত্রাণ কিংবা আর্থিক সহায়তা পৌঁছেনি। এদিকে, দেয়াড়া ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পরিদর্শন করেছেন ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আনিচুর রহমান আনিচ ও এক নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার গোলাম মোস্তফা। তার সাথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার