শুষ্ক মৌসুমে আগুন আর বর্ষাকালে বিষ প্রয়োগ ॥ প্রভাবাশালী মহলের কারণে গভীর সংকটে সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য

sundorbon
শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ॥ শুষ্ক মৌসুমে বনের গহীনে আগুন আর বর্ষাকালে বিরামহীন বিষ প্রয়োগের কারণে গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ, হরিনসহ গোটা জীব বৈচিত্র। বন সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত অসাধু প্রভাবশালীদের কারণে সৌন্দর্য হারাতে বসেছে বিশ্বের একক এই ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন। একের পর এক অগ্নিকান্ড ও ধারাবাহিকভাবে সুন্দরবনে বিষ ঢালার কারনে একদিকে যেমন উত্তপ্ত হচ্ছে জীব বৈচিত্রের আবাসস্থল সুন্দরবন অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদের। বন বিভাগের দুর্বলতার কারণে নাশকতাকারী চক্রের সদস্যরা বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় বন রক্ষা বর্তমানে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। বন সুরক্ষা কমিটির নেতাদের মতে নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে বন ধ্বংসের খেলা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। পাশাপাশি বন বিভাগের নানা সংকট ও দৈন্যদশা ঘুচিয়ে বন রক্ষকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বনজ সম্পদ লুন্ঠনকারী চক্রের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব নয়। খোদ বনবিভাগও মনে করে প্রতিটা অগ্নিকান্ডের পেছনে প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে। এটি নাশকতা ছাড়া কিছুই না এমন দাবি দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার।
জানা গেছে, গত ১৩ বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে অন্তত: ১৪ বার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রায় ৭০ একর বনভুমি পুড়ে গেছে বনবিভাগ এমন দাবি করলেও স্থানীয়দের মতে এর পরিমান কয়েকশ একর এবং ক্ষতির পরিমান কোটি কোটি টাকা। সর্Ÿশেষ গত ২৭ মার্চ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শিকদারের ছিলা এলাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসির সহায়তা নিয়ে ২০ ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় বনবিভাগ। এ অগ্নিকান্ডে প্রায় ১০ একর বন ভূমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ধারাবাহিকভাবে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলসহ বিভিন্ন মহল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আগুন লাগার সঠিক কারণ বনবিভাগ উদঘাটন করতে না পারলেও স্থানীয়দের ধারণা এটি পরিকল্পিত নাশকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ২০০৫ সালে পূর্ব সুন্দরবনের পচাঁকোরালিয়া, ২০০৬ সালে তেরাবেকা, ২০০৭ সালে ডুমুরিয়া, ২০০৪ সালে নাংলী ও মান্দারবাড়িয়া, ২০১০ সালে নাংলী টহলফাঁড়ির ট্যাপা, ২০১৪ সালে গুলিশাখালী টহলফাঁড়ির বাইশের ছিলা সর্বশেষ গত ২৭ মার্চ ধান সাগর ষ্টেশনের শিকদারের ছিলা এলাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ওইসব এলাকায় বারবার আগুন দিয়ে কোটি কোটি টাকার বনজ সম্পদ পুড়ে ছাই করা হয়েছে। অপরদিকে, সুন্দরবনে বার বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা প্রতিরোধে প্রেরিত সুপারিশের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে ফাইল বন্দি থাকাসহ তা আজও বাস্তবায়ন না হওয়ায় বার বার এমন ঘটনা ঘটছে বলে অভিমত বন বিশেষজ্ঞদের। এছাড়া সুন্দরবনে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমান শিং, মাগুর, কৈ, ভেটকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বাজারে ওই সকল দেশীয় মাছের চাহিদা বেশি থাকায় ওইসব এলাকায় জাল পাতার সুবিধার্থে মাছ শিকারের জন্য অসাধু জেলেরা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। অপরদিকে, একই রেঞ্জে বার বার অগ্নিকান্ডের ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করছেন না বনবিভাগের কর্মকর্তারাও। তারা মনে করেন কোন অসাধু চক্র নিজেদের স্বার্থ হাছিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সাইদুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন। অচিরেই তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

শেয়ার