যশোরে ১৫৬ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত ॥ সহিংসতা ও অনিয়ম হওয়ায় ৬ কেন্দ্রে ভোট স্থগিত, আটক ১০

voter
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরের ১৫টি ইউনিয়নের ১৬২ কেন্দ্রের মধ্যে ১৫৬ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্য ছয়টি কেন্দ্রে গোলযোগ ও অনিয়ম হওয়ায় সেখানে দায়িত্বরত ছয় প্রিজাইডিং অফিসারসহ ১০জনকে আটক করে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ছয়টির মধ্যে একটি চাঁচড়ার ভাতুড়িয়া ভোট কেন্দ্রে এক মেম্বার প্রার্থীর পক্ষের বোমা হামলা ও গোলাগুলিতে ভোট কেন্দ্রের বাইরে আব্দুস সাত্তার বিশে নামে এক পাপড় বিক্রেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নওয়াপাড়ার আড়পাড়া স্কুল কেন্দ্রে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়েছেন যুবলীগ কর্মী হাসান আলী (৩০)।
এদিকে, ১৫৬ কেন্দ্রেই সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮ টা থেকে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ শুরু হলে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। দুপুরের টানা রোদের মধ্যেও তারা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। সকাল ১০ টা। উপশহরের বি-ব্লক মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে। এ কেন্দ্রর প্রিজাইডিং অফিসার ওসমান গণি জানান, এখানে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ চলছে। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপশহর ডি-ব্লক ক্লাব মাঠ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছে। এরআগে সেখানে কিছু যুবক উচ্ছৃংখলতা করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পৌনে ১২ টার দিকে নওয়াপাড়া আইডিইবি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সুষ্ঠুভাবে ভোট হচ্ছে। এসময় প্রায় ৫০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন বলে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার বিদ্যুৎ কুমার কুন্ডু জানিয়েছেন। ১২ টা ৪৫ মিনিটের ঝুমঝুমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। কোন ধরনের ঝামেলা হয়নি বলে জানালেন ভোটারা। এভাবে প্রায় সব কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। তবে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে ৭/৮ জন সন্ত্রাসী ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে ব্যাপক বোমাবাজি শুরু করে। তারা কয়েক রাউন্ড গুলিও বর্ষণ করে। হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হলে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষায় গুলিবর্ষণ শুরু করে। এই বোমা হামলা ও গোলাগুলির এক পর্যায়ে ফেরিওয়ালা (ভাজা-পাপড় বিক্রেতা) আবদুস সাত্তারের শরীরে বোমা ও গুলি লাগলে তিনি নিহত হন। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ সেলিম জানান, কেন্দ্রে গোলাগুলি ও বোমা হামলার ঘটনার পর ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রে মোট ভোট ৩ হাজার ৫৫০জন। বেলা ১১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ৩৩ শতাংশ ভোট গ্রহণ হয়েছিল। একইসাথে এই কেন্দ্রের পাশের চাঁচড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটগ্রহণও স্থগিত করা হয়। যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, স্থানীয় বিল্লাল মেম্বার ও লালের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা এ বোমা হামলা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে।
এর আগে সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের আড়পাড়া স্কুল কেন্দ্রের বাইরে প্রতিপক্ষের হামলায় হাসান আলী (৩০) নামের যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। হাসানের শরীরে ৩টি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা আশংকাজনক। চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে প্রতিপক্ষ মেম্বার প্রার্থীর হামলায় আহত হয়েছেন ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বর প্রার্থী শুকুর আলী (৪০)। তিনি চুড়ামনকাটির খোদাবক্স’র ছেলে। এর আগে উপশহর ইউনিয়নের শহীদ স্মরণী স্কুল কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলা ঠেকাতে গিয়ে আহত হন মেহেরাব ইসলাম। তবে এ হামলা অতিউৎসাহীদের কাজ দাবি করে তার স্বজনদের সান্তনা দেন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এহসানুর রহমান লিটু। অন্যদিকে, বিকেলে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে উপশহর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে দায়িত্বরত এএসআই হুমায়ুন কবিরকে ক্লোজ করা হয়েছে।
৬ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত ও ৬ কর্মকর্তাসহ আটক ১০
সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগে যশোর সদর উপজেলার অন্তত ৬টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। এসময় ৬ জন নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ ১০জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আবদুস সালামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের চুড়ামনকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাশিমপুর ইউনিয়নের বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ অভিযান চালান। অনিয়ম ও জালভোটে সহযোগিতা করার অভিযোগে বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রফিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ইসরাত জাহান এবং চুড়ামনকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সরকারি প্রিজাইডিং অফিসার আব্দুল্লাহ বিন আকবরকে আটক করা হয়। দুপুরে উপশহর শহীদ স্মরণী বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে আটক করা হয় প্রিজাইডিং অফিসার সফিয়ার রহমান, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার তৌহিদুল ইসলামকে এবং গোয়ালদহের কন্যাদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র’র ভোটগ্রহণ স্থগিত করে আটক করা হয় প্রিজাইডিং অফিসার রবিউল ইসলামকে। অনিয়ম ও জালভোটে সহযোগিতা করার অভিযোগে এদেরকে আটক করা হয়। এছাড়া দৌলতদিহির ইব্রাহিম হোসেন, শ্যামনগরের রাসেল হোসেন, উপশহরের ডি-ব্লকের আনিস উদ্দিন, চুড়ামনকাটির মেম্বার প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট মঈদুল ইসলাম।
এদিকে, জেলা নির্বাচন অফিসার তারেক আহমেদ এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগে ছয়টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া কেন্দ্রগুলো হলো চুড়ামনকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাশিমপুর ইউনিয়নের বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া-ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁচড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোয়ালদহ-কন্যাদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও উপশহর শহীদ স্মরণী বিদ্যালয় কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে।

শেয়ার