আদালত অবমাননায় দোষী দুই মন্ত্রীর সাজা

montry
সমাজের কথা ডেস্ক॥ মীর কাসেম আলীর যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিল রায় নিয়ে মন্তব্যের জন্য সরকারের দুই মন্ত্রীকে আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করে ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে সাত দিনের মধ্যে এই অর্থ ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশে দিতে হবে। তা না হলে খাটতে হবে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড।
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন আট সদস্যের আপিল বিভাগ রোববার দুই মন্ত্রীর নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন নাকচ করে এই রায় দেন।
মার্চের শুরুতে যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের আপিল মামলার রায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন কামরুল ও মোজাম্মেল। ওই বক্তব্যের জন্যই আদালত তাদের অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করছে।
দুই মন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে আদালতে আবেদন করার পর গত ২০ মার্চ শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, দুই মন্ত্রীর বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তারা সর্বোচ্চ আদালতের অবমাননা করেছেন।
সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে তা ভঙ্গের পরিণাম কি হওয়া উচিৎ- তাও তিনি জানতে চেয়েছিলেন দুই মন্ত্রীর আইনজীবীদের কাছে।
রোববার রায়ের আগে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা উচ্চ আদালতের বিচারকরা সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করেছি। প্রতিবেদনে (দুই মন্ত্রী যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেই অনুষ্ঠান নিয়ে গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন) অনেকের নাম এসেছে। সবার নামে আমরা প্রোসিডিংস ড্র করিনি। প্রকৃতপক্ষে কনটেম্পট নিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করতে চাইনি।
“দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কনটেম্পট প্রোসিডিংস ড্র করা হয়েছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”
আদালতের মর্যাদা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা উচিৎ নয়- এ বিষয়টি যাতে দুই মন্ত্রীর সাজার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ বুঝতে পারে- সেই বার্তাই আপিল বিভাগ দিতে চেয়েছে বলে আদেশের পর সাংবাদিকদের জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আদালত অবমাননার দায়ে কোনো মন্ত্রীর সাজা এই প্রথম নয়। “আমার যতদূর মনে পড়ে, হাবিবুল্লাহ খান নামে একজনের সাজা হয়েছিল। তিনি ছিলেন এইচ এম এরশাদের সরকারের মন্ত্রী।”
গত ৫ মার্চ ঢাকায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির এক গোলটেবিল আলোচনায় কামরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর আপিল মামলার শুনানিতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দলের কাজ নিয়ে প্রধান বিচারপতির অসন্তোষ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ‘রায়েরই ইঙ্গিত’ মিলছে।
রায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন বেঞ্চে পুনঃশুনানির দাবি তোলেন সরকারের এই মন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকও প্রধান বিচারপতির মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। এর তিন দিনের মাথায় আপিল বিভাগ জামায়াত নেতা মীর কাসেমের আপিলের যে রায় দেয়, তাতেও মৃত্যুদন্ড বহাল থাকে। ওই রায় ঘোষণার আগে পুরো আপিল বিভাগকে নিয়ে বসে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দুই মন্ত্রীকে তলবের আদেশ দেন।
দুই মন্ত্রীর দেওয়া যে বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে তা বিচার প্রশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ এবং সুপ্রিম কোর্টের সম্মান ও মর্যাদাকে হেয় করার শামিল বিবেচনা করে আদালত অবমাননার রুল জারি হয় তাদের বিরুদ্ধে।
দুই মন্ত্রীর ওই বক্তব্য সে সময় তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। মীর কাসেমের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং বিএনপি নেতারা মন্ত্রীদের বক্তব্যকে ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ আখ্যায়িত করে বলেন, এটা বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ।
এ ধরনের মন্তব্য এড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে ধৈর্য্য ধরার আহ্বান জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিতর্কিত বক্তব্যে যুদ্ধাপরাধের বিচারই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেন, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কারও মন্তব্য করা উচিৎ নয়।
রায়ের আগের দিন সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে কথা বলেন। দুই মন্ত্রীর ওই বক্তব্য যে সরকারের ভাষ্য নয়, তা তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন বলে গণমাধ্যমের খবর।
আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ১৫ মার্চ সকালে আদালতে হাজির হন। অন্যদিকে বিদেশ সফরে থাকা খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আইনজীবী ব্যক্তিগত হাজিরার জন্য সময়ের আবেদন করেন। তারা দুজনেই ওই বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন আদালতের কাছে। কামরুলের সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ দুই মন্ত্রীর হাজিরার জন্য ২০ মার্চ নতুন তারিখ ঠিক করে দেয়।
ওইদিন তারা দুজনেই হাজির হলে আদালত জানায়, কামরুলের জবাব যথাযথ হয়নি। তাকে আবার ব্যাখ্যা দাখিলের জন্য ২৭ মার্চ দিন ঠিক করে দেয় আদালত। মোজাম্মেলকেও একই দিনে হাজির হতে বলা হয়। সে অনুযায়ী খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রোববার সকাল ৯টায় নির্ধারিত সময়ের আগেই আদালত কক্ষে হাজির হন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কামরুল নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবার নতুন করে আবেদন করেন। তবে রায়ে দুজনের আবেদনই আদালত খারিজ করে দেয়।

শেয়ার