সাতক্ষীরায় উৎসবমুখর পরিবেশে ৭৮ ইউপি’র ভোট গ্রহণ সম্পন্ন ॥ পুলিশের গুলিতে ২ দু’জন ও হামলায় ৪ আনসার সদস্য আহত

votar
আব্দুল জলিল/সিরাজুল ইসলাম ও মুজিবুর রহমান, সাতক্ষীরা ও পাটকেলঘাটা থেকে॥ সাতক্ষীরায় কিছু বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে ইউপি নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার সর্বত্রে উৎসবমুখর পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়। জেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর। যেখানেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেখানেই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভোটের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সরকার সমর্থকদের ওপর গুলি চালাতেও পিছু হটেনি পুলিশ। আ’লীগের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ ও ৪ আনসার সদস্য কমবেশি আহত হয়েছেন। এরবাইরে কলারোয়ায় দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলায় শিশুসহ কমপক্ষে ৮ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। অনিয়মের অভিযোগে ১৪টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল ও স্থগিত করা হয়েছে। তারপরও বিএনপি’র দুই প্রার্থী প্রেস কনফারেন্স করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। ভোট পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউপি ভোট অবাধ সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করতে প্রশাসন আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। যেকারণে ভোট কেন্দ্র দখল ও কারচুপির কোন চেষ্টা কাজে আসেনি।
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা ইউনিয়নের ভাগবাহ ভোট কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে ভোট জালিয়াতির সময় পুলিশের গুলিতে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস ও তার ছোট ভাই রুহুল আমিন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোর রাতে এ ঘটনা ঘটে। তাদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রুহুল কুদ্দুস ও রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভাগবাহ ভোট কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের ব্যালট পেপার কেটে বক্স ভর্তি করার চেষ্টা করছিলেন। দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার তাদের বাধা দিলে তারা চড়াও হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছোঁড়ে। এতে দু’জন পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। পাটকেলঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের হরিশ্চন্দ্রকাটি কেন্দ্রে ভোট কারচুপিতে বাঁধা দেয়ায় ৪ আনসার সদস্যকে পিটিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। আহত আনসার সদস্যরা হলেন, মিরাজ, কামরুল, ফরিদা ও নারগিস। অপরদিকে, কলারোয়া উপজেলার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের কলাটুপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আসলামুল হক রাতে প্রিজাইডিং অফিসারের নিকট থেকে জোর করে ব্যালট নিয়ে বক্স ভর্তি করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রিজাইডিং অফিসার গৌতম ঘোষ জানান, বিষয়টি আমি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। একই উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের বিএনপি’র চেয়ারম্যান প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন জানান, তার দেয়াড়ার বাড়িতে মধ্যরাতে কমপক্ষে ৫টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
এদিকে, ভোট জালিয়াতিসহ নির্বাচনী সহিংসতার কারণে জেলার তালা উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের তিনটি কেন্দ্র ও সদরের চারটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরুর পূর্বেই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুর রহমান ও সদরে নির্বাহি কর্মকর্তা শাহ আব্দুল সাদী জানান, নির্বাচনী সহিংসতার কারণে কুমিরা ইউনিয়নের ৩টি কেন্দ্র ও সদরের ৪টি কেন্দ্রে ও শ্যামনগরে ৩টি কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রগুলো হলো কুমিরা, ভাগবাহ, অভয়তলা ও দাদপুর সদরের আলিপুর ইউনিয়নের আলিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাড়–খালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আমিনিয়া মহিলা মাদ্রসা। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব পরবর্তীতে ভোট গ্রহণ করা হবে।
এদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে ৩টি কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার ভোররাতে এসব কেন্দ্রে ঢুকে ভোট জালিয়াতি ও প্রিজাইডিং অফিসারকে মারধরের ঘটনায় কেন্দ্রগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু সায়েদ মনজুর আলম জানান, কৈখালী ইউনিয়নের পূর্ব কৈখালী ও মাহজারিন স্কুল কেন্দ্রসহ ৩টি কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে, জেলার কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নে ৫টি কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জাসদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা শাহজান আলী। তিনি ইউনিয়নের ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে দাদপুর, হিজলদি, চান্দুড়িয়া, সুলতানপুরসহ ৫টি কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন।
অপরদিকে, সাতক্ষীরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, জেলার ৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৪ লক্ষ ২১ হাজার ২০১জন ভোটার যাতে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারেন তার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মিজানুর রহমান জানান, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে জেলায় ৬ স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলে সার্বক্ষনিক সতর্কাবস্থায় রাখা হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীদের সদস্যদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, আনসার ও বিজিবির ৩ হাজারেরও বেশি সদস্য মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত করা হয়। এছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছেন।
এদিকে কারচুপি, নির্বাচনে অনিয়ম ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ও কলারোয়া উপজেলার যুগেখালী ইউপি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ধুলিহর ইউপির বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যাপক মোদাচ্ছেরুল হক হুদা ও সংবাদকর্মীদের কাছে লিখিত বার্তা পাঠিয়ে কলারোয়া উপজেলার যুগেখালী ইউপি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রবিউল ইসলাম ভোট বর্জনের এই ঘোষণা দেন।

শেয়ার