গভর্নর আতিউরের পদত্যাগ ॥ রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মামলা, তদন্তে কমিটি, সরিয়ে দেয়া হয়েছে দুই ডেপুটি গভর্নর ও সচিবকে

Atiur

সমাজের কথা ডেস্ক॥ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ডলার লোপাটের প্রেক্ষাপটে গভর্নরের পদ ছাড়লেন আতিউর রহমান। তিনি গভর্নরের পদ ছাড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাশেমকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাংক সচিব এম আসলাম আলমকেও। আর রিজার্ভ চুরি ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের গচ্ছিত ওই অর্থ কীভাবে লোপাট হল, তা খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি করেছে সরকার। আর আতিউরের উত্তরসূরি হিসেবে সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবিরের নাম জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ডলার লোপাটের প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার গভর্নরের পদ ছাড়লেন আতিউর রহমান। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন। এর আগে সকালে গুলশানে নিজের বাসায় কয়েকজন সাংবাদিককে আতিউর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চাইলে’ তিনি পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছেন।
২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসাবে চার বছরের জন্য দায়িত্ব নেন আতিউর। এরপর তাকে আরও এক মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। ২০১৬ সালের ২ অগাস্ট তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। আতিউরের মেয়াদকালে দেশে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েকগুণ বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে সঞ্চিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাট হওয়ার খবর প্রকাশের পর সমালোচনার মধ্যে পদ ছাড়লেন আতিউর। ফিলিপিন্সের ডেইলি ইনকোয়ারারে ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাটের খবর এলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে।
তদন্তে জানা যায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে সঞ্চিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই অর্থ ফিলিপিন্সের একটি ব্যাংকে সরিয়ে ফেলা হয়।
শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সরানো হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।
গভর্নরের দায়িত্ব পালনকালে দেশ-বিদেশে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পান আতিউর রহমান। গত বছর লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা দি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস তাকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংকার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করে। এর আগে ফিলিপিন্সের গুসি শান্তি পুরস্কার পান তিনি। আতিউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ২৮ নভেম্বর, জামালপুরে। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি পান ১৯৮৩ সালে।
মাস্টার্স পড়ার সময়ই ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে প্ল্যানিং অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আতিউর রহমান। ১৯৮৩ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে (বিআইডিএস)৷ এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্রঋণ বিপ্লব নিয়ে অনেক গবেষণামূলক লেখা রয়েছে তার। প্রবন্ধের জন্য এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
এদিকে, রিজার্ভ চুরি যাওয়ার পর তা গোপন করে সমালোচনার মধ্যে থাকা গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। আর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের গচ্ছিত ওই অর্থ কীভাবে লোপাট হল, তা খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি করেছে সরকার।
রিজার্ভ চুরির খবর প্রকাশা হওয়ায় নানামুখী আলোচনার মধ্যে চাপে থাকা গভর্নর মঙ্গলবার সকালে পদত্যাগ করার বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংক মামলার এজাহার নিয়ে যায় মতিঝিল থানায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে এই মামলা করেন বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে করা এই মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে।” এরআগে দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রিজার্ভের এই অর্থ চুরি তদন্তে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠনের কথা জানান।
কমিটির অন্য দুজন সদস্য হলেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউচার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কমিটির কাজের ক্ষেত্র ও আওতা জানানো হয়।
এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে পেমেন্ট ইন্সট্রাকশন কীভাবে এবং কার বরাবর গেছে-কমিটিকে তা খতিয়ে বের করতে বলা হয়েছে।
অবৈধ পরিশোধ ঠেকানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপের পর্যাপ্ততা ছিল কি না, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রাখার যৌক্তিকতা ছিল কি না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।
চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা এবং গৃহীত এবং অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গৃহীত ব্যবস্থাও এই কমিটিকে দেখতে বলা হয়েছে।
রিজার্ভ চুরি নিয়ে তুমুল আলোচনার মধ্যে গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাশেমকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রিজার্ভ চুরি নিয়ে চাপে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পর দুই ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা ও আবুল কাশেমকেও সরিয়ে দিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার আতিউর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র দিয়ে আসার পর শেরে বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে এক প্রাক বাজেট আলোচনায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানান অর্থমন্ত্রী।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই দুই পদে শিগগিরই নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে।”
এই দুজন বাদ পড়ায় এখন ডেপুটি গভর্নর পদে আছেন আবু হেনা মো. রাজী হাসান ও এস কে সুর চৌধুরী। দুই ডেপুটি গভর্নরকে অব্যাহতি দেওয়ার পর ব্যাংক সচিব এম আসলাম আলমকেও সরানো হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার পর সাংবাদিকদের একথা জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

শেয়ার