খুলনায় ভৈরব-রূপসা নদীর জমি দখল ও পানি দূষণের মহোৎসব

nodi
খুলনা ব্যুরো॥ খুলনায় নদী দখল ও দুষণ প্রতিরোধে সরকার বাস্তবমুখী কোন প্রকল্প গ্রহন না করায় রূপসা ও ভৈরব নদী এখন বুড়িগঙ্গার মত করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভুমিদস্যুদের কালো থাবায় নদী হারাচ্ছে তার প্রশস্ততা। আর অর্থ পিচাশের মলমুত্র ইতিমধ্যে নদীর পানিকে বিষিয়ে তুলেছে। তবে মানুষের মতো চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতে না পারলেও ভৈরব ও রূপসা নদী যে সারাক্ষণ কেঁদেই চলেছে তা দেখলেই বুঝা যায়। যদিও তাদের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পারলেও অবৈধ অর্থ পকেটস্থ করে তারা ঠুটো জগন্নাথ হয়ে আছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনা টাউন প্রোটেকশন প্রজেক্টের কোন অগ্রগতি নেই। খেয়াল রাখেননি এ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মেয়র এমপিরা। সরকার প্রধানও গুরুত্ব দেননি বিভাগীয় শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহি নদী দু’টি রক্ষায়। এনিয়ে খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ও পরিবেশবাদীরা বারবার তাগাদা দিলেও তার কোন সুফল দেখতে পায়নি গত ৭ বছরে খুলনাবাসি। সূত্রমতে, খুলনা মহানগরীর পাশ দিয়ে বয়ে চলা রূপসা ও ভৈরব নদীর পানি ব্যাপক দূষণের কবলে পড়ে ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে। নদীর তীরে অবস্থিত ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, কঠিন বর্জ্য, ঝুলন্ত পায়খানায় নির্গত মানব বর্জ্য, শত শত ড্রেন বেয়ে আসা ময়লা আবর্জনা বিষিয়ে তুলছে এ দু’টি নদীর পানি। এছাড়া অবৈধভাবে খাল ও নদী দখলের প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে আসছে এসব নদী ও খাল। পরিবেশবিদদের আশংকা দূষণ ও দখল প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে রূপসা ও ভৈরবের পরিণতি হবে বুড়িগঙ্গার মতো। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীর তিন দিক নদী দ্বারা বেষ্ঠিত। নগরীর পাশে রয়েছে রূপসা, ভৈরব, ময়ূর ও কাজীবাছা নদী। ভৈরব ও রূপসার দুই তীরে ফিস্ প্রসেসিংসহ ৫৩টি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৪০টির। এসব প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া কারখানার বর্জ্য শোধন করে রূপসায় ফেলার নিয়ম থাকলেও খরচ বাঁচাতে অনেক প্রতিষ্ঠানই সে নিয়ম মানছে না। নগরীর দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-এর তিনটি তেলের ডিপো ধোয়া-মোছার পর সেই তেলযুক্ত পানি সরাসরি চলে যাচ্ছে ভৈরব নদে। পরিবেশবিদদের মতে ভেঁসে থাকা তেলের কারণে সূর্যের আলো নদীর পানির নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্য পোনার নার্সারী গ্রাউন্ড ধক্ষংস হচ্ছে। এছাড়া ভৈরব ও রূপসা নদীর দুই তীরে রয়েছে ১০টি পাটকল। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও ম্যাচ ফ্যাক্টরীর রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী নদী দূষণের জন্য আরেকটি কারণ হলো সিটি কর্পোরেশনের কয়েকশ’ ড্রেনের পানি কোন ধরনের শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে গড়িয়ে পড়া। এছাড়া নদীর তীরে রয়েছে অসংখ্য ঝুলন্ত পায়খানা। যেভাবে দূষিত পানি, বর্জ্য ও রাসায়নিক দ্রব্য নদীতে পড়ছে তাতে পানি আর বেশিদিন ব্যবহারের উপযোগী থাকবে না এমন আশংকা পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার। ওই কর্মকর্তা জানান, একটি বেসরকারি সংস্থা অভয়নগর থেকে মংলা পর্যন্ত নদীর পানি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছে। সহসাই তালিকাভুক্ত ওই সব প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্কীকরণ নোটিশ দেয়া হবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর থেকে খুলনায় নদী ও খাল দখলে চলছে মহোৎসব। সূত্রমতে, রূপসা ও ভৈরবের দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার তীর ভূমির অধিকাংশ স্থান অবৈধ দখলদারদের কবলে। হিমায়িত চিংড়ি রফতানিকারক কয়েকটি কারখানা, পাথর ভাঙ্গা প্রতিষ্ঠান, বেশ কিছু দোকানপাট, বস্তি বাড়ি গড়ে উঠছে নদীর তীর দখল করে। খুলনার সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার ‘বড় বাজার’ এর একটি বড় অংশ নদী দখল করে আছে ব্যবসায়ীরা। বিআইডব্লি¬উটিএ ইতোপূর্বে একাধিক নদী দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করে। ওই তালিকা অনুযায়ী রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে কমপক্ষে ২ শতাধিক অবৈধ দখলদার রয়েছে।
বিআইডব্লি¬উটিএ সূত্রমতে, নদীর দু’তীরে আমাবস্য ও পূর্ণিমার জোয়ারের সর্বোচ্চ জলরেখা থেকে ৫০ গজ ওপর পর্যন্ত জমি বিআইডব্লি¬উটিএ’র। এসব জমিতে স্থাপনা গড়তে হলে তাদের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে নগরীর লবণচরা থেকে মজুদখালী পর্যন্ত রূপসা ও ভৈরব নদীর দুই তীরে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা স্থাপনা। ময়ূর নদী দখল করে পাকা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। কাজিবাছা ও ময়ূর নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল ও নদীতে নানা বর্জ্য ফেলে নদীকে করছে সংকুচিত এবং পানি হচ্ছে দূষিত। এছাড়া নদীর গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। পলি ও বর্জ্য দ্বারা অব্যাহতভাবে ভরাট হচ্ছে। কাজীবাছা নদী দখল করে মাছের ঘের, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা নির্মাণ এবং শুকনা মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। জানা যায়, বিভিন্ন সময় অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশবাদী বেসরকারি সংস্থা বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারি মাহাফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ইনভারমেন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল¬ান্ট (ই,টি,পি)’র ছাড়পত্র ছাড়াই নদীর দু’পাড়ে গড়ে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ই,টি,পি থাকলেও খচর বাড়ার ভয়ে তা’ ব্যবহার করা হয় না। এ বিষয় দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তা ব্যক্তিরা অজ্ঞাত কারণে বরাবরই নীরব থাকেন। তিনি নদী দূষণ ও দখল রোধে ঢাক-ঢোল না পিটিয়ে ঝটিকা অভিযানের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি আহবান জানান।

শেয়ার