সেদিনও আদরের শিশুপুত্র মিরাজকে নিজহাতে খাইয়ে দেন মা সালেহা

miraz
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সেদিনও আদরের শিশুপুত্র মিরাজকে নিজহাতে খাইয়ে দেন মা সালেহা বেগম। এরপর মিরাজ সাইকেল চড়ে বের হয় বন্ধুদের সাথে বাওড় দেখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কে জানত, এটাই তার শেষযাত্রা। দু’বছর তিন মাস ধরে ছেলে হারানোর কষ্ট বুকে চেপে পার করছিলেন সন্তানহারা সালেহা। রোববার রায় ঘোষণার পর তিনি বললেন, ছেলের খুনীদের ফাঁসির আদেশে তার ক্ষোভের আগুন সামান্য হলেও কমেছে। তিনি চান দ্রুত রায় কার্যকর। তাহলেই কেবল তার নিষ্পাপ শিশুসন্তানের আত্মা শান্তি পাবে।
খুলনার দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে এ মামলার রায় ঘোষণার পর একই ধরণের প্রতিক্রিয়া জানান চাঞ্চল্যকর স্কুলছাত্র মিরাজের বাবা ও মামলার বাদি মিজানুর রহমানও। তিনি বলেন, আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। একই সাথে পলাতক আসামিদের আটক করে রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা কামনা করেন প্রশাসনের কাছে।
উল্লেখ্য, যশোরের ঝিকরগাছার লাউজানী গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে স্কুলছাত্র রিয়াজুল ইসলাম মিরাজকে (১৩) মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ ও পরে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মিরাজকে অপহরণের জন্য লাউজানী এলাকার আব্দুল হক মেম্বরের ছেলে মিলন (২৯) ও তার সহযোগীরা ১৬ নভেম্বর পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিরাজের পূর্ব পরিচিত মতিউর ও আরিফুলকে এর সঙ্গে সংযুক্ত করে। এদের মাধ্যমেই তাকে ২০ নভেম্বর বাওড় দেখানোর কথা বলে নিয়ে যায় এবং যশোর সদরের নারাঙ্গালী গ্রামের একটি বাড়িতে আটকে রাখে। পরে মিরাজের পিতা মিজানুর রহমানের কাছে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ নিয়ে তারা দেন দরবার করে এক পর্যায়ে আড়াই লাখ টাকায় নেমে আসে এবং বিকাশের মাধ্যমে দু’দফায় ৮ হাজার টাকা আদায়ও করে।
কিন্তু মিরাজ অপহরণকারীদের চিনে ফেলায় তার হাতে কলম দিয়ে তাদের নাম লিখে রাখে। এতে আতঙ্কিত হয়ে ধরা পড়ার ভয়ে পরদিন ২১ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরাজকে অপহরণকারীরা নারাঙ্গালী গ্রামের খালের পাড়ে নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়। দুর্বৃত্তরা মিরাজকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার হাতের বিভিন্ন স্থানে এবং জিহ্বা কেটে ফেলে রাখে। এর দু’দিন পর ২৩ নভেম্বর বিকালে প্রথমে মিরাজের ব্যবহৃত সাইকেল ও পরে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে অপহরণের একদির পরই মিরাজকে হত্যা করলেও দুর্বৃত্তরা মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা থানায় মামলা দায়েরের পর চাঞ্চল্যকর এই অপহরণ ও হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে নামে র‌্যাব। র‌্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের তৎকালিন কোম্পানি কমান্ডার মেজর আহসান হাবিব রাজীব জানান, মোবাইল ট্র্যাকিং ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা প্রথমে ঝিকরগাছার জয়কৃষ্ণপুরের আক্তারুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলামকে (১৬) আটক এবং অপহরণের কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। তার তথ্যের ভিত্তিতে লাউজানি রিফিউজি পাড়ার ইসরাঈল হোসেনের ছেলে মতিউর রহমানকে (১৬) আটক ও আরও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। পরে ২৭ নভেম্বর রাতভর অভিযান চালিয়ে লাউজানীর ইউসুফ আলীর ছেলে মহসিন রেজা শাহীন (২৪), লক্ষ্মীপুর গ্রামের গোলাম হোসেনের ছেলে মামুন চৌধুরী মুকুলকে (২২) আটক এবং অপহরণকারী চক্রের মোট ৭ সদস্যকে সনাক্ত করা হয়।
আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে মুক্তিপণের দাবিতে মিরাজকে তারা অপহরণ করে। অপহরণকারী ৪ জনের মধ্যে মতিউর ও আরিফুল একই স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র।
মিরাজ ঝিকরগাছা বিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলো। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর চুড়ান্ত পরীক্ষা শুরুর ১০ দিন আগে তাকে অপহরণ করা হয়। মিরাজ পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছিল।

শেয়ার