ঝিকরগাছার স্কুলছাত্র মিরাজ হত্যায় ৫ জনের ফাঁসি ॥ আরও ৪ জনের যাবজ্জীবন কারাদ-॥ দু’বছর চার মাসের মধ্যে রায় ঘোষণা

mira
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যশোরের ঝিকরগাছার চাঞ্চল্যকর স্কুল ছাত্র রিয়াজুল ইসলাম মিরাজ হত্যা মামলায় পাঁচজনের ফাঁসি ও চারজনের যাবজ্জীবন দ-াদেশ দিয়েছেন খুলনার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল। রোববার খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এমএ রব হাওলাদার এ রায় দিয়েছেন। দুই বছর তিন মাস ২০ দিন পর আদালত এই রায় দিলেন।
ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্তরা হলেন, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানি গ্রামের আবদুল হক মেম্বরের ছেলে জাহিদ হাসান মিলন, ইউসুফ আলীর ছেলে মো. মহসিন রেজা শাহিন (পলাতক), গোলাম হোসেনে ছেলে মামুন চৌধুরী মুকুল (পলাতক), আবদুল খালেকের ছেলে মো. রুবেল, শুকুর মিয়ার ছেলে মো. সোহাগ। পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনীত দ-বিধির ৩০২/৩৪ ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
স্কুল ছাত্র মিরাজ হত্যার ঘটনায় আরও ৪জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন দ-াদেশপ্রাপ্তরা হলেন, যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে ইকবাল হোসেন, নারাঙ্গালী গ্রামের হয়রত আলীর স্ত্রী রাশিদা বেগম জানকি, ঝিকরগাছার লাউজানি গ্রামের নুরুল হকের ছেলে আবুল কাসেম ওরফে কাসু (পলাতক), যশোর সদর উপজেলার নারঙ্গালী গ্রামের আবদুল কাদেরের ছেলে হয়রত আলী (পলাতক)। এদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে ১ বছরের সশ্রম কারাদ-ে দ-িত করা হয়েছে।
নিহত স্কুল ছাত্র মিরাজের পিতা মিজানুর রহমান বলেন, সন্তানের খুনের বিচার দাবিতে আইনের আশ্রয় নিয়েছিলাম। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা করি। আদালত তথ্য প্রমাণে যেটা সঠিক মনে করেছে, সেই রায় দিয়েছে। আদালতের রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন আমাদের একটাই দাবি দ্রুত আদালতের রায় কার্যকর করা হোক। মিজানুর রহমান আরও বলেন, খুনিরা বিভিন্ন সময়ে হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিল। রায় ঘোষণার পর নিরাপত্তা নিয়ে শংকা আছি।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর কোতোয়ালি থানার পুলিশ সদর উপজেলার নারাঙ্গালি গ্রামের খালপাড়া থেকে শিশু মিরাজের লাশ উদ্ধার করে। নিহত মিরাজ ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানি গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে ও ঝিকরগাছা বিএম হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ছেলে হত্যার ঘটনায় মিজানুর রহমান বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার অজ্ঞাত আসামিদের নামে মামলা দায়ের করেন।
এ অপহরণ ও হত্যাকা-ের জড়িত অভিযোগে র‌্যাব ঝিকরগাছা উপজেলার লাউজানী এলাকার ইউসুফ আলীর ছেলে মহসিন রেজা শাহীন (২৪), লক্ষ্মীপুর গ্রামের গোলাম হোসেনের ছেলে মামুন চৌধুরী মুকুল (২২), লাউজানি রিফিউজি পাড়ার ইসরাঈল হোসেনের ছেলে মতিউর রহমান (১৬) ও জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের আক্তারুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলামকে (১৬) আটক করে। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতভর অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের সদস্যরা মিরাজ হত্যাকারীদের চিহ্ণিতকরণ, আটক ও রহস্য উদ্ঘাটন করে।
আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে মুক্তিপণের দাবিতে ঝিকরগাছা বিএম হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মিরাজকে (১৩) তারা অপহরণ করে। অপহরণকারী ৪ জনের মধ্যে মতিউর ও আরিফুল একই স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র। মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি করলেও তারা মিরাজকে একদিন পরেই হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় তারা। সেসময় র‌্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর আহসান হাবিব রাজীব সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ২০ নভেম্বর স্কুল ছাত্র মিরাজ অপহরণ ও ২৩ নভেম্বর তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে তারা এর রহস্য উদ্ঘাটনে নামেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা প্রথমে আরিফুলকে আটক এবং অপহরণের কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। তার তথ্যের ভিত্তিতে মতিউরকে আটক ও আরও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে মামুন ও শাহীনকে আটক এবং অপহরণকারী চক্রের মোট ৭ সদস্যকে সনাক্ত করা হয়।
মেজর আহসান হাবিব রাজীব আরও জানান, মিরাজকে অপহরণের জন্য এ চক্রের হোতা লাউজানী এলাকার আব্দুল হক মেম্বরের ছেলে মিলন (২৯) ও তার সহযোগীরা ১৬ নভেম্বর পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিরাজের পূর্ব পরিচিত মতিউর ও আরিফুলকে এর সঙ্গে সংযুক্ত করে। এদের মাধ্যমেই তাকে ২০ নভেম্বর বাওড় দেখানোর কথা বলে নিয়ে যায় এবং নারাঙ্গালীর একটি বাড়িতে আটকে রাখে।
পরে মিরাজের পিতা মিজানুর রহমানের কাছে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ নিয়ে তারা দেন দেরবার করে এক পর্যায়ে আড়াই লাখ টাকায় নেমে আসে এবং দু’দফায় ৮ হাজার টাকা আদায়ও করে।
কিন্তু অপহৃত মিরাজ অপহরণকারীদের চিনে ফেলায় তার হাতে কলম দিয়ে তাদের নাম লিখে রাখে। এতে আতঙ্কিত হয়ে ধরা পড়ার ভয়ে পরদিন ২১ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরাজকে অপহরণকারীরা নারাঙ্গালী গ্রামের খালের পাড়ে নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়। এর দু’দিন পর মিরাজের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

শেয়ার