বৃক্ষ মানব আবুলের সেবা করে অনন্যা স্ত্রীর পরিচয় দিয়েছেন হালিমা

abul istry
আব্দুল আজিজ (খুলনা) পাইকগাছা॥ প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে বিরল রোগে আক্রান্ত বৃক্ষ মানব আবুল বাজনদারের সেবা করে অনন্যা এক স্ত্রীর পরিচয় দিয়েছেন, হালিমা খাতুন। একমাত্র শিশু কন্যাকে কোলে নিয়েই ঢাকা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আবুলের সার্বক্ষণিক সেবা যতœ করে নিজেকে গর্বিত মনে করছেন স্ত্রী হালিমা। উল্লেখ্য খুলনা জেলার পাইকগাছা পৌর সদরের মানিক বাজনদারের ছেলে বৃক্ষ মানব আবুল বাজনদারের সাথে বিয়ে হয় দাকোপের চুনকুড়ি গ্রামের পিতৃহারা অনন্যা হালিমার।
একান্ত সাক্ষাতকারে হালিমা জানান, পরিবারের অমতে ভালবেসে বিয়ে করেছি আবুলকে। অনেকে বাধা দিয়েছে, এরকম ছেলেকে বিয়ে করো না, কিন্তু আমি শুনিনি। তাকেই বিয়ে করেছি। আমি তাকে ভালবাসি। মা-বাবা হয়তো আরেক জায়গায় বিয়ে দিতো। কপাল মন্দ হলে সেখান থেকেও তো ফেরত আসতে হতো। আর তার এই অসুখ যদি বিয়ের পরে হতো, তাহলে কী তাকে ফালায়ে যেতে পারতাম আমি। মানুষটাতো অনেক ভালো, প্রথমে তাকে দেখে মায়া লাগছে, পরে ধীরে ধীরে ভালবেসেছি। মানুষের বাড়িতে পানি দেই, কাঁথা সেলাই করে উপার্জন করি যতোটুকু পারি। আধপেট খাই, কতোদিন না খাইয়া থাকছি, কিন্তু ছাইড়্যা যাই নাই।
বিয়ে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হালিমা বলেন, বিয়ের আগে একদিন তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে যায় সেখানেই আবুলের সাথে পরিচয় হয়। মাঝে মধ্যে তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেলে আবুলের সাথে দেখা হত। এরপর মাঝে মধ্যে কথা বলতে বলতে তাকে ভালবেসে ফেলি। বিয়েতে আমার মা রাজি না হওয়ায় ২০১১ সালে তার বাড়িতে চলে যাই এবং পরিবারের অমতে আবুলকে বিয়ে করি। বিয়ের পরেও আমার মা আমাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। ২০১৩ সালে আমাদের একটি মেয়ে হয়। মেয়ের জন্মের পর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এখন মা বেড়াতে আসেন, আমিও যাই। নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে হালিমা জানান, আমি একজন ভাল ছাত্রী ছিলাম, চুনকুড়ি গ্রামের শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এ-মাইনাস পেয়ে চালনা মহিলা কলেজে ভর্তিও হয়েছিলাম। তিনমাস ক্লাস করেছি, তারপরই আবুলের পরিবারে চলে আসি। হালিমা বলেন, লেখাপড়ায় অনেক আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু গরিব ঘরে জন্ম। এজন্য আমার স্যারেরা অনেক সাহায্য করেছেন। লালউদ্দিন স্যার, তাপসী ম্যাডাম, ঠাকুর দাস স্যার আমাকে কেরোসিন তেল কিনে দিয়েছেন, বৃষ্টির দিনে ভিজে ভিজে স্কুলে যেতাম বলে স্যাররা ছাতা কিনে দিয়েছেন, পোশাক দিয়েছেন, বীজ গণিত কম বুঝতাম, ক্লাস টেনের টেস্টের পর সমীরণ স্যার নিজে তিনমাস বিনা পয়সায় অংক করাইছেন-বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন হালিমা। বলেন, বই-খাতা কেনার সামর্থ্য ছিল না, স্কুলের পরীক্ষার খাতার যেসব সাদা পাতা থেকে যেত স্যাররা সেগুলো আমাকে দিতেন, আমি সেগুলো সেলাই করে খাতা বানিয়ে লিখতাম। আবুল মানুষ হিসেবে কেমন জানতে চাইলে হালিমা জানান, খুবই ভালো মানুষ। আর কথা কাটাকাটি, রাগারাগি তো সব সংসারেই কমবেশী হয়ে থাকে, দু’টো মানুষ একসঙ্গে থাকলে মতের অমিল হবেই, আর মানুষটা হাতে পায়ে পাথরসমান বোঝা নিয়ে ১০ বছর ধরে অসুস্থ, প্রচণ্ড ব্যথায় কাঁদতো, তখন ভালো কথাও সহজভাবে নিতো না, এতে আমি তার দোষ দেই না। এমন কষ্ট যার হয় সেই কেবল বোঝে, তার কেমন লাগে। কখনও চিন্তা করিনি যে, তার হাত আবার সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে পাবে। তবে এজন্য চেষ্টা করেছি অনেক। আবুল বাজানদারের হাত পায়ে শিকড়ের মতো গজাঁনো এই বিরল রোগে মানুষ যতোটা না বিস্ময় প্রকাশ করেছে, তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছেন আবুলের বিবাহের কথা শুনে। গত ১০ বছরেও অধিক সময় আবুল বিরল রোগে ভুগছেন। সর্বশেষ গত ৩০ জানুয়ারি বিরল রোগ ‘ইপিডার্মোডিসপ্লাসিয়া ভ্যারুসিফরমিসে আক্রান্ত হয়ে আবুল বাজানদার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি তার ডান হাতের অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে সুস্থ আছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অপারেশনের পরে ভালো লাগছে, উনি এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। আমার চেয়ে খুশি আর কে হতে পারে-কথাগুলো যখন হালিমা বলছিলেন তখন তার চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করছিল। তবে এটা বোধহয় কষ্টের কান্না নয়, ‘আনন্দশ্রু।

শেয়ার