পদ্মার বুকে ‘স্বপ্ন নির্মাণ’ ॥মূল পদ্মাসেতুর ২০ শতাংশ, নদীশাসনের ১৬ শতাংশ, অ্যাপ্রোচ সড়কের ৬০ শতাংশসহ সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে

fil222e
সমাজের কথা ডেস্ক॥ পদ্মার মাওয়া ঘাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমবিইসি)-৪ বিশাল ভাসমান বার্জ। এখান থেকেই প্রতি সেকেন্ড পর পর ভারী শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে পদ্মা। শব্দ আছড়ে পড়ছে দূর সীমানার তীরেও। সেই শব্দে বেড়ে উঠছে একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের নাম পদ্মাসেতু।
স্পিড বোটে বার্জের কাছে যেতেই শব্দ আরও বাড়তে থাকে। তারপর বার্জে উঠে চোখে পড়ে পাইল ড্রাইভের দৃশ্য। যেখানে সেকেন্ডে সেকেন্ডে নদীর তলদেশের দিকে যাচ্ছে পাইল। বার্জে উঠে দেখা গেল শ্রমিকরা সবাই কানে তুলা গুঁজে রেখেছেন।
কানে তুলা কেন? ভাসবান বার্জে কর্মরত শ্রমিক শফিকুলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কানে তুইলু (তুলা) না দিলে বিরাট শব্দে কান ফাটি যাবার নাগছে। হার্ট দুর্বল হলি সমস্যা।’
বিকট শব্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক কারণ পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য বিশেষ অর্ডারে বানানো হয়েছে জার্মান প্রযুক্তির এই হাইড্রোলিক হ্যামার। অত্যাধুনিক এই হ্যামারে ২৫শ’ টন ওজনের চাপ দেওয়া হচ্ছে।
পদ্মাসেতু প্রকল্পের সব থেকে চ্যালেঞ্জিং এই পাইলিংয়ের কাজ এভাবে এগিয়ে চলছে শব্দের তালে তালে। সেতুর একেকটি পিলারের জন্য এ রকম ছয়টি পাইল দাঁড়াবে। তার উপর হবে পিলার। ৪২টি পিলারের প্রত্যেকটির নিচে ৬টি করে মোট ২৫২টি পাইল বসবে। এছাড়া দুই পাশের সংযোগ সড়কের জন্য স্থাপিত দু’টি পিলারের গোড়ায় বসবে আরও ১২টি পাইল।
সেতুর ৪২টি পিলারে ছয়টি করে ২৪০টি এবং দুই পাড়ের ১২টিতে দু’টি করে ২৪টি পাইল বসাতে হবে। সর্বমোট ২৬৪টি পাইল বসবে।
সরেজিমনে চায়না মেজর ব্রিজের প্রকৌশলীরা জানান, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শক্তির এই হ্যামার দেড় ঘণ্টা একের পর এক আঘাত করে তলদেশে এক মিটার পাইলিং করতে সক্ষম হয়।
মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়াসহ কয়েক ভাগে বিভক্ত পদ্মাসেতু প্রকল্পের কাজ।

পাইলিং কাজের ভাসমান বার্জের সেফটি সুপারভাইজার আরিফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, হ্যামারটি ২৫শ’ টন শক্তি নিয়ে আঘাত করে পাইলে। এভাবে দেড় ঘণ্টার আঘাতে মাত্র এক মিটার ভেতরে ধাবিত হয় পাইল।
যে পাইল ড্রাইভিং চলছে দুপুর পর্যন্ত তা ১৪০ মিটারের মধ্যে ৭০ মিটার তলদেশে পৌঁছে গেছে বলেও জানান আরিফুল।
ভি আকৃতির মতো করে সেতুর পাইলগুলো দাঁড়িয়ে থাকবে। এজন্য বাঁকা করে পাইল ড্রাইভ চলছে। প্রতিটি পাইলের গায়ে মিটার লেখা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছে কত গভীরে যাচ্ছে তা।
মাঝ নদীতে মূল পাইল ছাড়াও অন্যান্য কাজ এগিয়ে নিতে শত শত বার্জ আর ক্রেন এখন কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়ে কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শুধু পাইল নয়, নদী শাসনের জন্য ব্লক তৈরির কাজও এখন চলছে বেশ জোরেশোরে। এদিকে পাইলিংয়ের পাশাপাশি একই সঙ্গে চলছে অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি, রেললাইন ও গ্যাসলাইনসহ অন্যান্য কার্যক্রম।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মূল সেতুর ২০ শতাংশ, নদীশাসনের ১৬ শতাংশ, অ্যাপ্রোচ সড়কের ৬০ শতাংশসহ সব মিলিয়ে গড়ে সেতুটির ৩০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
মূলত পাঁচটি প্রধান প্যাকেজে ভাগ করে কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কাজ ১৫০ কোটি ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) ব্যয়ে মূল সেতু নির্মাণ। আর ১০০ কোটি ডলার (প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা) ব্যয়ে নদী শাসন। সঙ্গে রয়েছে তিনটি অপেক্ষাকৃত ছোট প্রকল্প। এর মধ্যে অন্যতম অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ। মাওয়া অংশে কেবলই সড়ক, তবে জাজিরা অংশে রয়েছে সড়কের পাশাপাশি আরও অন্তত পাঁচটি সেতু নির্মাণের কাজ।
এত বড় প্রকল্প কখনও বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (৮ হাজার কোটি টাকা) কিছু বেশি দিয়ে বাস্তবায়িত হয় বঙ্গবন্ধু সেতুর কাজ। একনেক সভায় পদ্মাসেতু প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। দেশীয় অর্থায়নে এগিয়ে চলেছে চ্যালেঞ্জিং এই নির্মাণ কাজ।

শেয়ার