মীর কাসেমের চূড়ান্ত রায় ৮ মার্চ

Mir

সমাজের কথা ডেস্ক॥ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডাদেশ পাওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় জানা যাবে ৮ মার্চ।
দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ বুধবার রায়ের এই দিন ঠিক করে দেয়।
বেঞ্চের অপর চার সদস্য হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
শুনানির সপ্তম দিনে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। পরে আসামিপক্ষে সমাপনী বক্তব্য দেন মীর কাসেমের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাহজাহান।
আদালত প্রথমে রায়ের জন্য ২ মার্চ দিন রাখলেও পরে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে তা পরিবর্তন করে ৮ মার্চ ঠিক করা হয় বলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান জানান। মীর কাসেমের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর আপিলে রায়ের পর্যায়ে আসা সপ্তম মামলা এটি।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আমার মূল আর্গুমেন্ট ছিল দুটি হত্যাকান্ডে তাকে (মীর কাসেম) ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে। ..বক্তব্য রেখেছি এটা বহাল রাখার জন্য।”
অন্যদিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য মীর কাসেমের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের আশা, “.. যেভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ এসেছে এই মামলায় মীর কাসেম আলী খালাস পাবেন।”
মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদসহ আটজনকে হত্যার দুটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তখনকার আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদন্ড দেয় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল।
র কাসেমের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে যে ভবনটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের ধরে নিয়ে নির্যাতন চালানো হতো, সেই ডালিম হোটেলকে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয় ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’।
বিচারক ওই রায়ে বলেন, “আলবদর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসতো আমৃত্যু নির্যাতন করার উদ্দেশ্যেই। এটাও প্রমাণিত যে, ডালিম হোটেলে আলবদর সদস্যদের পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন মীর কাসেম আলী নিজে। ডালিম হোটেল সত্যিকার অর্থেই ছিল একটি ‘মৃত্যুর কারখানা’।”
ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর আলাদা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “ডালিম হোটেলে ঘটে যাওয়া সবধরনের অপরাধের ব্যাপারে সবকিছুই জানতেন মীর কাসেম। এসব অপরাধে তার ‘কর্তৃত্বপূর্ণ’ অংশগ্রহণও প্রমাণিত। ফলে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪ (২) ধারা অনুযায়ী তিনি ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের’ দোষে দোষী।”
ট্রাইব্যুনালের রায় : ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি অভিযোগ এনেছিল প্রসিকিউশন। এর মধ্যে দশটি ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়। আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে।
এর মধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার পর তার এবং আরো পাঁচজনের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
আর ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস ওরফে লাঠুকে ও টুনটু সেন ওরফে রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে জাহাঙ্গীরকে ছেড়ে দেওয়া হলেও লাঠু ও রাজুকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়।
১১ নম্বর অভিযোগে তিন বিচারক কাসেমকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজার রায় দেয়। তবে ১২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে এক বিচারক আসামিকে খালাস দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়ায় ফাঁসির রায় আসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগের সবগুলোতেই অপহরণ করে নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেমকে ২০ বছর কারাদণ্ড, ১৪ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদন্ড এবং বাকি ছয় অভিযোগের প্রতিটিতে সাত বছর করে কারাদন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেমের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়।
একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেপ্তার করার পর ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে মীর কাসেমকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যুদ্ধাপরাধের বিচার।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলে ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম। দেড়শ পৃষ্ঠার মূল আবেদন ও এক হাজার ৭৫০ পৃষ্ঠার নথিপত্রসহ করা আপিলে তিনি সাজা বাতিল করে খালাস চান।
ওই আপিলের ওপর ৯ ফেব্রুয়ারি শুনানি শুরুর পর সাত কার্যদিবস দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে আদালত রায়ের দিন ঠিক করে দিল।
দুই পক্ষের যুক্তি : শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “ডালিম হোটেলে নিয়ে যে অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে, আসামিরা কিন্তু তা অস্বীকার করেনি। আসামিপক্ষের মূল বক্তব্য ছিল, সে সময় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন না। মীর কাসেম আলীর পক্ষে তার বোন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে উনি উল্টো কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, মীর কাসেম আলী কুমিল্লায় থাকতেন, তার বাবার সঙ্গে। কাজেই তাদের যে প্লি অব অ্যালিবাই, তা প্রমাণ হয়নি।”
জসীম, টিন্টো সেন, রঞ্জিত দাসকে হত্যার দায় থেকে মীর কাসেম আলী কোনোভাবেই ‘অব্যাহতি পেতে পারেন না’ বলে মন্তব্য করেন মাহবুবে আলম।
অন্যদিকে খন্দকার মাহবুব হোসেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতির কক্ষে সাংবাদিকেদের বলেন, “আমরা দেখাতে চেয়েছি মীর কাসেম আলী চিটাগাং ইসলামী ছাত্র সংঘের সেক্রেটারি ছিলেন একাত্তরের প্রথম থেকে। ৭ নভেম্বরের আগে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল নাৃ হঠাৎ করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে জনসম্মুখে হেয় করার জন্য। এক্ষেত্রে সরাসরি কোনো এভিডেন্স নেই।”
“প্রসিকিউশনের ডকুমেন্ট থেকে আমরা প্রমাণ করেছি, ঘটনার যে তারিখ দিয়েছে- তখন তিনি ঢাকায় ছিলেন।”

শেয়ার