বেনাপোলে ভাষাপ্রেমীদের মিলনমেলা

bena
এম এ রহিম, বেনাপোল॥ ভাষা, মা-মাটি ও নাড়ির টানে বেনাপোল নোম্যান্সল্যান্ডে বসেছিলো দু’পারের মানুষের মিলনমেলা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষার টানে দুই বাংলার হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এ অনুষ্ঠানে। ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে কেবলমাত্র ভাষার টানে রোববার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও নিরাপত্তা গেট উপেক্ষা করেই দলে দলে মানুষ যোগ দেন একুশে’র মিলন মেলায়। যা জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
সকাল ১০টায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতি প্রিয় মল্লিক, লোকসভার বনগাঁ অঞ্চলের সংসদ সদস্য মমতা ঠাকুর, বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, উত্তর ২৪ পরগনার জেলা পরিষদের সভাপতি রহিমা মন্ডল ও বনগাঁ পৌর মেয়র শংকর আঢ্যর নেতৃত্বে ভারত থেকে আসা শত শত বাংলা ভাষী মানুষ বাংলাদেশিদের ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেয় একে অপরকে। নোমান্সল্যান্ডে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের পক্ষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেন, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক আব্দুল মজিদ, সাবেক জেলা শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক আসিফ-উদ-দ্দৌলা সরদার অলোক, মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন সরদার, বেনাপোল বন্দরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র সেন, বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সংগীত পরিশ্রেণ করে।
ভাষার আকর্ষণ ও বাঙালির নাড়ির টান যে কতটা আত্মিক ও প্রীতিময় হতে পারে তাও বুঝিয়ে দিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই সঙ্গে এপার-ওপার দুই বাংলার গণমানুষের ঢল ফের প্রমাণ দিলো দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি ভাষার। উভয় দেশের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি এখনো যে অটুট রয়েছে তা বোঝা গেল অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই বাংলার অতিথিদের বক্তব্যে।
এরপর ভারতীয় মন্ত্রীসহ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশের চেকপোস্টের মঞ্চে। এই মঞ্চে শহীদদের স্মরণে কোরআন তেলোয়াত ও গীতা পাঠের মধ্যদিয়ে শুরু হয় আলোচনা সভা।
সভায় প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ৫২ এর ভাষা সংগ্রামের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে আমাদের আত্মার সম্পর্ক, নাড়ির সম্পর্ক। সে জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে আমাদের এই ভাষা আন্দোলন। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি আরো বলেন, এদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ আজ মাথা চড়া দিয়ে উঠছে। দুই দেশের নেতৃত্বে এই জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা হবে। তিনি দুই বাংলার মধ্যে শুধু একুশের অনুষ্ঠান নয়, অন্যান্য দিবসের সময় এ রকম অনুষ্ঠান আয়োজনের আহবান জানান।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, আপনারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাষা আর স্বাধীনতার জন্য এতো ত্যাগের নজীর পৃথিবীতে অন্য কোন জাতির নেই। এ জন্য আপনারা গর্বিত জাতি। ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি। দুই বাংলার মানুষ একসঙ্গে মাতৃভাষা দিবস পালন করছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনারা ভাল থাকলে আমরাও ভাল থাকবো। তিনি আরো বলেন, আমরা কেন একদিন এ অনুষ্ঠান করবো। আমরা ৩৬৫ দিনই এ অনুষ্ঠান করতে চাই। কেন পাসপোর্ট ভিসা গেট হবে। সব খুলে দেয়া উচিত। কারণ দুই বাংলার মানুষ খুব কাছের মানুষ। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এই বাংলারই মানুষ ছিলেন। দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলার মধ্যদিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে। আমার এসেছি অন্তরের টানে। বার বার ছুটে আসি। দেশ বিভক্তি হলেও ভাষার পরিবর্তন হয়নি। আমরা ওপারে থাকলেও শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ সকল ভাষা সৈনিকের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল।
দুপুরে ভারতীয় মন্ত্রী ও একুশ উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অতিথিদের সঙ্গে করে নিয়ে যান পেট্রাপোল সীমান্তে একুশের মঞ্চে। সেখানে আলোচনা সভায় দুই দেশের মাতৃভাষা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দসহ অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। উভয় মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃতি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দুই বাংলার নামী-দামি শিল্পীদের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, ফকির আলমগীর একুশের সংগীত পরিবেশন করেন। ভাষা শহীদদের স্মরণে দুই বাংলার মানুষের সম্প্রতি আর ভালোবাসার বাঁধনকে আরো সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় ভাষাপ্রেমীদের মিলন মেলা।

শেয়ার