যশোরে অবৈধ গাইড কিনতে বাধ্য করছেন শিক্ষকরা

guide book
দেবু মল্লিক॥
শিক্ষা বছরের শুরুতে যশোরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সিলেবাস দেওয়া হয়েছে। সেই সিলেবাস অনুযায়ী ইতিমধ্যে শ্রেণি কক্ষে পাঠদানও চলছে। তবে শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। কারণ সিলেবাসের বাংলা ও ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রে সরাসরি পাঠ্যসূচি উল্লেখ নেই। লেখা হয়েছে ভাবসম্প্রসারণ ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর। এভাবেই রচনা, চিঠি, সারাংশ, সারমর্ম, প্রতিবেদন ও অনুবাদের সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। আর স্কুল থেকে বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার সরবরাহকৃত বই নয়, ইংরেজির জন্য এ্যাডভান্স কোম্পানির গাইড এবং বাংলার জন্য জননী সিরিজের বইয়ে এই বিষয়গুলো পাওয়া যাবে।
শহরের আব্দুস সামাদ, সম্মিলনী ইন্সটিটিউট, এমএসটিপি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এন্ড কলেজ, বাদশা ফয়সাল, যশোর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মুসলিম একাডেমিসহ জেলার কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সরবরাহকৃত সিলেবাস পর্যালোচনা করে এমন তথ্য মিলেছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে নোট ও গাইড বইয়ের কাটতি বাড়াতে শিক্ষকরা এমন সিলেবাস তৈরি করেছেন। আর এই তথ্য বাতলে দিয়েছেন প্রকাশনী কোম্পানি।
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধাবিকাশে সরকার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যে কোন ধরণের নোট বা গাইড বই নিষিদ্ধ করলেও তা মানছেন না যশোরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তারা ‘বিশেষ’ কারণে বিভিন্ন প্রকাশনা কোম্পানির ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণসহ গাইড ও নোট বই শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করছেন। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোম্পানির গাইড বই কিনতে বাধ্য হয়। এছাড়া শ্রেণি শিক্ষকরাও নির্ধারিত বই কিনতে চাপ দিচ্ছেন। তবে বিষয়টি অভিভাবকরা জানলেও ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় শিক্ষকরাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন এমন আশংকায় কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না।
জানা যায়, সরকার ১৯৮১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে গাইড ও নোট বই নিষিদ্ধের আইন করে। প্রথমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও পরে মাধ্যমিক স্তরে সরকার বিনামূল্যে পাঠ্য বই সরবরাহ শুরু করে। এই নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোন বই পড়ানো যাবে না বলে নিদের্শনাও রয়েছে। কিন্তু যশোরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনা মানছে না। তারা জননী, লেকচার, পাঞ্জেরীসহ বিভিন্ন পাবলিকেশন কোম্পানির বাংলা ও ইংরেজি গ্রামারসহ নেট ও গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন।
দেশে বিদ্যমান ১৯৮১ সালের আইন অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে গাইড ও নোট বই নিষিদ্ধ। কিন্তিু সেই আইন অমান্য করে যশোরে প্রকাশ্যে এই ‘বেআইনি পণ্য’ বিক্রি হলেও প্রশাসন থেকে তা বন্ধে কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সম্মিলনী ইন্সটিটিউটের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্র জানায়, শিক্ষকরা ক্লাসে এসে বই কিনতে বলে দিয়েছেন। সেই বই পড়ানো হচ্ছে। যারা এখন কিনতে পারেনি তারা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায, যশোর শহরের নামে-বেনামি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে নোট বা গাইড বই কিনছেন। তাদের স্কুল এমনভাবে সিলেবাস তৈরি করেছে যে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট গাইড ছাড়া তাদের পড়া খুঁজে বের করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, স্কুল থেকে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোম্পানির নোট বা গাইড বই কিনতে বাধ্য হয়। সিলেবাসে সরকার সরবরাহকৃত পাঠ্য বইয়ের বিষয় অন্তর্ভূক্ত না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নির্ধারিত কোম্পানির গাইড বইয়ের বিষয় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। তাই সিলেবাস শেষ করতে হলে শিক্ষার্থীদের নির্দেশিত গাইড কেনা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
সম্মিলনী ইন্সটিটিউট ও আব্দুস সামাদ একাডেমির দুই জন সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার মর্তে জানান, পাঁচ স্তরে অর্থ দিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা কোম্পানি এভাবে সিলেবাস তৈরি করিয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শ্রেণি শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষক সমিতির নেতাদের তারা বছরের শুরুতে মোটা অংকের টাকা দিয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুপাতে সেই টাকা পরিমাণ নির্ধারিত হয়। যশোরে বিভিন্ন স্কুলে তারা ৩০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে। এছাড়া শিক্ষক নেতারাও এজন্য প্রকাশনী কোম্পানির কাছ থেকে বড় একটা টাকা পেয়েছে। তাই আইনে না থাকলেও যশোরের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নোট ও গাইড বই পড়নো হচ্ছে।
যশোরের প্রকাশ্যে ‘বেআইনি পণ্য’ নোট ও গাইড বই বিক্রি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা বন্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বছরের শুরুতেই জেলা প্রশাসকের অফিসের পাশে বিশাল বই বাজরে প্রকাশ্যে এই সব নোট ও গাইড বই বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর অবশ্য দবি করেছেন, শ্রেণি কক্ষে পড়ানো নিষিদ্ধ হলেও আইনে এসব বই বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়নি।

শেয়ার