সড়কে ঝরে গেল ৮ প্রাণ ॥ যশোরে কলেজ ছাত্রসহ ৪, সাতক্ষীরায় স্কুলছাত্রী এবং বাগেরহাটে ইউপি চেয়ারম্যানের পিতা ও ভাইসহ ৩ জন নিহত

accedent
সমাজের কথা ডেস্ক॥ যশোরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এক কলেজছাত্রসহ নিহত হয়েছে চার জন। সাতক্ষীরায় বাসচাপায় নিহত হয়েছে এক স্কুল ছাত্রী। বাগেরহাটের কচুয়ায় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান মাহাফুজুর রহমানের পিতা ও ভাই। অপরদিকে, শরণখোলায় চাকায় শাড়ির আঁচল পেচিয়ে নিহত হয়েছেন কাকতী রাণী নামে এক গৃহবধূ। গতকাল পৃথক এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ২৫ জন। সোমবার সকাল ৮টায় যশোর-মাগুরা সড়কের ভাটার আমতলায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক নারীসহ দুইজন নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। দুপুরে একই সড়কের যশোর সদর উপজেলার কোদালিয়া মোড়ে বাস চাপায় কলেজছাত্র আরিফ হোসেন (২২) মারা গেছেন। তিনি পরীক্ষা দিতে আসার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন। এছাড়া যশোর- বেনাপোল সড়কের বেনেয়ালি গদখালীর মাঝামাঝি এলাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারালে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন। সোমবার সকালে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বাঘারপাড়া ভাটার আমতলায় দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন চট্রগ্রামের আগ্রবাদের হাজিপাড়া একসেস রোড এলাকার জাহিদ হোসাইনের স্ত্রী সালমা সুলতানা শেলী ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার বিজয় চন্দ্র মজুমদারের ছেলে প্রকাশ চন্দ্র মজুমদার।
যশোরের বাঘারপাড়ার খাজুরা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মাসুদ জানান, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা বেনাপোলগামী গ্রীনলাইন পরিবহনের একটি এসি বাস সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে যশোর-মাগুরা মহাসড়কের লেবুতলার ভাটার আমতলা এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় বিপরীতমুখি একটি ট্রাকের সাথে বাসটির সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে দু’জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন, নিহত সালমার স্বামী জাহিদ হোসাইন (৪৫), সালমার দেবর জাকির হোসেন, চট্টগ্রামের রাউজানের জুলফিকার আলী, তার মেয়ে শামিমা সুলতানা (১৯), রাউজানের দক্ষিন সুলতারপুরের সুজিত চৌধুরী (৫২), রাউজানের আবুল কালাম (৬৬), তার স্ত্রী সাজেদা বেগম, কন্যা সহেদা সিদ্দিকা (২১), ঢাকার আনোয়ার (৪০), আগ্রাবাদের শফিউল আলম, প্যারাডাইস মোড়ের সৈয়দ আজগর আলী, চট্টগ্রাম এবিবিএস এলাকার রফিকুলের ছেলে রিজভী (১৪), বাউফলের আবুল কালাম (৬০)। বাকীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এই বাসীর অধিকাংশ যাত্রী ভারতের কলকাতায় যাচ্ছিলেন। আবার কেউ আজমীর শরীফ, কেউ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়েও যাচ্ছিলেন।
দুপুরে একই সড়কের যশোর সদর উপজেলার কোদালিয়া মোড়ে বাস চাপায় কলেজছাত্র আরিফ হোসেন (২২) মারা গেছেন। তিনি পরীক্ষা দিতে আসার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন। যশোর কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ ইলিয়াস হোসেন জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে যশোর-মাগুরা সড়কের কোদালিয়া মোড়ে একটি যাত্রীবাহী বাস পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয়। এতে মোটরসাইকেল আরোহী আরিফ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
তিনি জানান, আরিফ যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অনার্স দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। আজ তার পরীক্ষা ছিল; তিনি পরীক্ষা দিতে যশোর শহরে যাচ্ছিলেন। নিহত আরিফ যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে।
অপরদিকে, যশোর-বেনাপোল সড়কের বেনেয়ালি গদখালীর মাঝামাঝি এলাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারালে একজন নিহত ও তিনজন আহত হন। নিহত মাগফেরাত (২৮) সাতক্ষীরা সদরের জালাল মোহরীর ছেলে। তিনি বাসের ছাদ থেকে ছিটকে পড়েন। ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ মোল্লা খবির জানান, বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে গাছের সাথে ধাক্কা খায়।
আহতরা হচ্ছেন নিহত মাগফেরাতের ভগ্নিপতি আব্দুস সালাম (৫০), যশোর সদরের সাড়াপোল গ্রামের রবিউল ইসলাম (৬৫) ও তার ভাই নূর মোহাম্মদ। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক ওয়াহেদুজ্জামান আজাদ জানান, মাগফেরাতকে নিহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।
এদিকে, বাগেরহাট থেকে কামরুজ্জামান জানান, সোমবার দুপুরে কচুয়া উপজেলার মোড়েলগঞ্জ-কচুয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের বিছট নামক এলাকায় একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যানের সাথে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান কচুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মাহাফুজুর রহমানের পিতা আলহাজ্ব শেখ আনোয়ার হোসেন (৮৫) ও তার ছোট ভাই হুমাউন কবির (৪৫)। নিহতরা মোটরসাইকেলযোগে সাইনর্বোড বাজারের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা হন। এসময় স্থানীয়রা ভ্যানচালক ও যাত্রীসহ ৩ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যানকে ওভারটেক করার সময় মোটরসাইকেলের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এসময় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে নিলে কত্যর্বরত চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন ও ছেলে হুমাউন কবিরকে মৃত ঘোষণা করেন। কচুয়া প্রতিনিধি রথীন্দ্র নাথ সাহা জানান, বাগেরহাট সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোশারফ হোসেন ঘটনাস্থলে নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে মর্মান্তিক এই হতাহতের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা ভ্যানচালক ও যাত্রীসহ ৩জনকে উদ্ধার করে কচুয়া উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান মাহাফুজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, তার বৃদ্ধ পিতা ও ছোট ভাই মোটরসাইকেল করে সাইনবোর্ড বাজারে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন। কচুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ শমশের আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
শরণখোলা (বাগেরহাট) থেকে এমাদুল হক শামীম জানান, শরণখোলায় মোটরচালিত ভ্যানের চাকায় শাড়ির আঁচল পেচিয়ে কাকতী রাণী (৪৫) নামে এক গৃহবধূর প্রাণ গেছে। সোমবার দুপুর ১টার দিকে উপজেলার খাদা গ্রামের তালকদার বাড়ি সংলগ্ন সড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কাকতী রাণী মালিয়া গ্রামের অমল চন্দ্র বড়ালের স্ত্রী। হাসপাতাল, প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, কাকাতী রাণী তার ছেলে অমিতাভের জন্য বই কিনতে মোটরচালিত ভ্যানে চড়ে উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারে যাচ্ছিলেন। এসময় তার শাড়ির আঁচল ভ্যানের চাকায় পেচিয়ে গেলে চলন্ত ভ্যান থেকে তিনি ছিটকে পাকা সড়কের ওপর পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, ভ্যানে বসে কাকতী রাণী তার মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ফোনে কথা বলার কারণে তিনি শাড়ির আঁচল পেচানোর বিষয়টি টের পাননি।
সাতক্ষীরা ও দেবহাটা প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বহেরায় দুটি যাত্রীবাহী বাসের পাল্লাপাল্লিতে জীবন গেছে সুমাইয়া নামে এক স্কুল ছাত্রীর। অপর এক ছাত্রীর জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিতে অগ্নিসংযোগ করে এবং রাস্তা অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রায় দু’ঘন্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়কের বহেরায় সোমবার সকাল ৯ টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে কালিগঞ্জ অভিমুখে যাওয়া কক্সবাজার-জ ০৪-০০১৩ নম্বরের একটি যাত্রীবাহী বাস অপর এক বাসকে অতিক্রম করে আগে ওঠার সময় বহেরা এটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীা শশাডাঙ্গা গ্রামের আনিছুর রহমান মিঠুর মেয়ে সুমাইয়া ও খাসখামার গ্রামের আরশাদ আলীর মেয়ে আমিনা পারভিন বাসের নিচে চাপা পড়ে। এ সময় ছাত্রীরা সাইকেলে করে স্কুলে যাচ্ছিল। এ ঘটনায় পথচারীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মারাত্মক আহত সুমাইয়া খাতুন ও আমেনা খাতুনকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে আমেনাকে খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সুমাইয়াকে দুপুর আড়াইটার দিকে খুলনায় নেয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এ খবর স্কুলে ও তার পরিবার এবং এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শোকের পাশাপাশি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বহেরা এটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিভূতিভূষন দত্ত সুমাইয়ার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বেপরোয়া গতিতে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ পথচারীরা গাড়ি দুটিতে হামলা করে একটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ গাড়িটি আটক করেছে। যার নং (কক্সবাজার জ ০৪-০০১৩)। পরে সাতক্ষীরা থেকে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি যেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

শেয়ার