আমির খানের হাফ সেঞ্চুরি

pk
সমাজের কথা ডেস্ক॥
বলিউডের ওপর রাজত্ব করে চলা তিন খানের মধ্যে তাকে বলা হয় পারফেকশনিস্ট খান। নিখুঁত হওয়ার প্রচেষ্টায় তিনি প্রতিবারই নিজেকে ছাড়িয়ে যান। নতুন কিছু করে তাক লাগিয়ে দেন দর্শকদের আর বক্স-অফিসেও ধরে রাখেন সিংহাসন, কিন্তু বেলা শেষে ধার ধারেন না কোনো অ্যাওয়ার্ডের। তিনি আমির খান।

তাকে কোনো ছাঁচে ফেলার উপায় নেই। ‘লাগান’-এর গ্রাম্য তরুণ ‘মঙ্গল পান্ডে’তে হয়ে যায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা, আবার ‘থ্রি ইডিয়টস’ – এর উচ্ছ্বল উদ্ভাবক ‘তারে জমিন পারে’র শিক্ষক আর সবশেষে ‘পিকে’র ভিনগ্রহবাসীর চরিত্রের কথা না বললেই নয়। তবে ভুলে গেলে চলবে না এই আমিরই ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তাক’ – এর সাহসী প্রেমিক।

১৪ মার্চ জীবনের অর্ধশতক পুরো করলেন আমির খান। জন্ম তার ১৯৬৫ সালে মুম্বাইয়ে। পুরো নাম মুহম্মদ আমির হুসেন খান। বাবা তাহির হুসেন ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক। চাচা নাসির হুসেন ছিলেন প্রখ্যাত পরিচালক-প্রযোজক। কিংবদন্তী অভিনেতা দিলীপ কুমারও তার আত্মীয়। ফলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচয় তার ছোটবেলা থেকেই। মাত্র আট বছর বয়সেই অভিনয়ে হাতে খড়ি। নাসির হুসেনের সুপার হিট ‘ইয়াদো কি বারাত’ ছবিতে ১৯৭৩ সালে শিশু অভিনেতা হিসেবে প্রথম রূপালি পর্দায় আসেন আমির খান। পরের বছর বাবার প্রোডাকশনের ছবি ‘মাধহোশ’ এ অভিনয় করেন। স্কুল জীবনে ছিলেন টেনিস চ্যাম্পিয়ন। জাতীয় পর্যায়েও খেলেছেন তিনি। তবে শৈশব-কৈশোরে বেশ অর্থকষ্টে দিন কেটেছে। তাহির হুসেনের ছবিগুলোর অধিকাংশ বাণিজ্যিকভাবে অসফল। সে কারণে পাওনাদাররা অতিষ্ঠ করে তুলতো জীবন। স্কুলের বেতন বাকি পড়তো প্রায়ই। এই সব টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠেন আমির খান।

ষোল বছর বয়সে তিনি একটি নীরিক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ‘প্যারানইয়া’ নামের এ ছবির পরিচালক ছিলেন তার সহপাঠী আদিত্য ভট্টাচার্য। ছবি তৈরির খরচ দিয়েছিলেন তাদের পরিচিত এক ব্যক্তি। আমিরের বাবা-মা একবারেই চাননি ছেলে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে নিজেকে জড়াক। তাহির হুসেনের ব্যর্থতায় ভয় পেয়ে তারা চেয়েছিলেন ছেলে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হোক বা কোনো স্থিতিশীল পেশায় যাক। কিন্তু অভিনয়ের নেশা ছিল আমিরের রক্তে। তিনি ‘অবান্তর’ নামে একটি মঞ্চ নাটকের দলে যোগ দেন এবং ব্যাক স্টেজে কাজ করতে থাকেন। ‘অবান্তরে’র গুজরাটি নাটক ‘কেশর বিনা’তে একটি ছোট ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

উচ্চমাধ্যমিকের পর আমির তার বাবা-মায়ের শত অনুরোধেও আর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে রাজি হননি। বরং চাচা নাসির হুসেনের ছবিতে সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।‘মানজিল মানজিল’(১৯৮৪) এবং ‘জবরদস্ত’(১৯৮৫) নামে দুটি ছবিতে সহকারি পরিচালকের কাজ করেন। এর পাশাপাশি তিনি কয়েকটি তথ্যচিত্রে অভিনয় করেন। এ সময় পরিচালক কেতন মেহতার নজরে পড়েন এবং নিরীক্ষাধর্মী ছবি ‘হোলি’তে অভিনয় করেন।‘হোলি’ ব্যবসা সফল হয়নি।তবে নাসির হুসেন এবং তার ছেলে মানসুর তাদের ছবি ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তাক’ এর নায়ক চরিত্রে তাকে সুযোগ দেন। এটি ছিল মানসুরের পরিচালিত প্রথম ছবি। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে জুহি চাওলার বিপরীতে অভিনয় করেন আমির খান। বাকিটা তো ইতিহাস। বিয়োগান্তক প্রেমের ছবিটি সুপার ডুপার হিট হয়। মারদাঙ্গার ভিড়ে নিটোল প্রেমের এ ছবি বলিউডের নতুন মোড় সৃষ্টি করে। নব্বইয়ের দশকে প্রেমের ছবির ধারা শুরু হয় এ ছবি থেকেই। ফিল্মফেয়ার আসরে ‘সেরা নবাগত’র পুরস্কার জিতে নেন আমির। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

১৯৯০ সালে তার অভিনীত পাঁচটি ছবি মুক্তি পায়। এর মধ্যে সুপার হিট হয় মাধুরী দীক্ষিতের বিপরীতে অভিনীত ‘দিল’। ১৯৯১-এ মুক্তি পায় পূজা ভাটের বিপরীতে ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’। হলিউডি ছবি ইট হ্যাপেনড ওয়ান নাইট’ এর বলিউডি রিমেইকে তার অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়। একইভাবে ‘ক্র্যামার ভার্সেস ক্রামারে’র রিমেইক ‘আকেলে হাম আকেলে তুম’ এবং ‘অ্যান অ্যাফেয়ার টু রিমেমবার’-এর হিন্দি রিমেইক ‘মন’ ছবিতেও তার অভিনয় হৃদয়গ্রাহী।

নব্বইয়ের দশকে আমির খান অভিনীত ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’, ‘হাম হ্যায় রাহি পেয়ারকে’, ‘রঙ্গিলা’, ‘বাজি’, ‘আন্দাজ আপনা আপনা’ সব ছবিই ব্যবসা সফল। ‘আন্দাজ আপনা আপনা’তে আমির প্রমাণ করেন কমেডিতেও তিনি অনন্য।

১৯৯৬তে মুক্তি পায় ‘রাজা হিন্দুস্থানি’। এ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতে নেন তিনি। ‘ইশক’, ‘গুলাম’ , ‘সারফারোশ’ ব্যবসা সফল হওয়ার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পায়|। দীপা মেহতার ‘আর্থ’ ছবিতে অভিনয় করে অভিনেতা হিসেবে সমালোচকদের প্রশংসায় সিক্ত হন তিনি।

নতুন সহস্রাব্দ শুরু হয় ‘মেলা’ ছবি দিয়ে। এতে সহোদর ফয়সাল খানের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। এ ছবিটি বক্স-অফিসে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি। তবে নতুন শতকে নিজেকে যেন ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভিযানে নামেন আমির। ২০০১ সালে মুক্তি পায় ‘লাগান’। ছবিটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে বিদেশী ভাষার সেরা ছবি বিভাগে মনোনয়ন পায় এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। জিতে নেয় ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আর আমির খান দ্বিতীয়বারের মতো সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয় করেন ফিল্মফেয়ার আসরে। ফারহান আখতারের পরিচালনায় ‘দিল চাহতা হ্যায়’ ছবিতে অভিনয় করেও ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি।

চার বছর বিরতির পর মুক্তি পায় ‘মঙ্গল পান্ডে: দ্য রাইজিং’। ১৯৪৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের নায়ক মঙ্গল পান্ডের ভূমিকায় অসামান্য অভিনয় করেন আমির।

রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরার ‘রং দে বাসান্তি’ মুক্তি পায় ২০০৬ সালে। ছবিতে আমিরের অভিনয় তাকে এনে দেয় ফিল্মফেয়ার আসরে সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা অভিনেতার পুরস্কার। বাফটায় সেরা বিদেশী ছবির মনোনয়নও পায় সেটি। ২০০৬ সালেই মুক্তি পায় সুপার হিট ‘ফানা’।

২০০৭ সালে পরিচালক, প্রযোজক এবং অভিনেতা হিসেবে আরেকটি অসামান্য কাজ উপহার দেন আমির।ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুকে নিয়ে গড়ে ওঠা ‘তারে জমিন পার’ বলিউডের সেরা সিনেমাগুলোর অন্যতম নিঃসন্দেহে।

২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গজিনি’ হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে প্রথম একশো রুপি আয় করা সিনেমা। ফিল্ম ফেয়ারে সেরা অভিনেতার মনোনয়নও পান তিনি। আর ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘থ্রি ইডিয়টস’ তো গড়ে ইতিহাস। ছবিটি বলিউডের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ আয়কারী সিনেমায় পরিণত হয়। ৬টি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড এবং ১৬টি আইফা অ্যাওয়ার্ড জয় করে ছবিটি।

২০১২ সালে টিভি অনুষ্ঠান ‘সত্যমেভ জয়তে’ উপস্থাপনা শুরু করেন আমির। এখানেও ব্যতিক্রমী চিন্তার পরিচয় দেন তিনি। সমাজের গুরুতর সমস্যাগুলো তুলে ধরা অনুষ্ঠানটি একই সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠান হিসেবে প্রশংসিত হয়। ২০১১ সাল থেকেই তিনি শিশু অপুষ্টি দূর করার কার্যক্রমে ইউনিসেফের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন।

২০১২ তে আমির অভিনীত ‘তালাশ’ এবং ২০১৩তে ‘ধুম থ্রি’ ব্লকবাস্টার হিট হয়।

আর সর্বশেষ মুক্তি প্রাপ্ত ‘পিকে’ সিনেমায় নগ্ন হয়ে আবির্ভূত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। আর সিনেমাটি এখন পর্যন্ত বলিউডের ইতিহাসে সর্বাধিক আয়কারী ছবির রেকর্ড গড়েছে।

অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার হিসেবে সফল আমির খান পেয়েছেন চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, সাতটি ফিল্মফেয়ার। ২০০৩ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১০ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন|। বিভিন্ন ধরনের সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত এই অভিনেতা বরাবরই রাজনীতিতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন|। ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শত ব্যক্তির একজন বিবেচিত হন তিনি।

শেয়ার