“যার হাতে মানুষ পোড়া গন্ধ, তার সঙ্গে কিসের সংলাপ?”

pm
সমাজের কথা ডেস্ক॥ অবরোধ আহ্বানকারী খালেদা জিয়ার সংলাপের প্রস্তাব আবার নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
“যার হাতে মানুষ পোড়া গন্ধ, যে মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না, যে জঙ্গিনেত্রী, তার সঙ্গে কিসের সংলাপ?” শনিবার এক আলোচনা সভায় বলেছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি চেয়ারপারসনের আহ্বানের একদিন পরই শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের অনুষ্ঠানে এই প্রতিক্রিয়া আসে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর।

বিএনপি জোটের লাগাতার হরতাল-অবরোধে নাশকতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির জন্য খালেদা জিয়াকে সরাসরি দায়ী করে আসছেন শেখ হাসিনা।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির সহিংস আন্দোলনের মধ্যে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথাও বলেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া সরকারকে উদ্দেশ্য করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ‘মিথ্যা’ বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

সংলাপের আহ্বানের জবাবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে তার কার্যালয়ে গিয়ে ফিরে আসার ঘটনাগুলো তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

“ফোন করলে গালি শুনব। উনার (খালেদা জিয়া) ছেলে মারা যাওয়ার পর দেখা করতে গেলে কেউ গেইট খুলল না। সংলাপ কী বাতাসে হবে?”

“ইলেকশনের আগে তো বলেছিলাম, যে মন্ত্রণালয় চাইবে, স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলেও দেব। চেয়েছিলাম, সবাই মিলে নির্বাচন করি। উনি ইলেকশন বর্জন নিজের দোষে করেছেন।”

জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে আদালতে আত্মসমর্পণ করার আহ্বানও জানিয়েছেন সরকার প্রধান। তা না হলে তাকে গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।

“কোর্টে সমন জারি হয়েছে, সেখানে গিয়ে স্যারেন্ডার করুক, ওটাই উনার জায়গা। না হলে সরকার কোর্টের আদেশ মানতে বাধ্য।”

“যারা সরকার প্রধান থাকেন, তাদের তো প্রথমে আইন মানতে হবে,” খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার বিষয়টি মনে করিয়ে দেন শেখ হাসিনা।

চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের প্রচেষ্টা তুলে ধরে তিনি বলেন, “খালেদা জিয়া যে কষ্ট দিচ্ছে, তা যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়, তার জন্য যা যা করার তা করব।”

গত ৬৪ দিনের অবরোধ-হরতালে ১২১ জন নিহত হয়েছেন, যার অধিকাংশ মারা গেছেন পেট্রোল বোমা কিংবা গাড়িতে আগুন দেওয়ায়। সহস্রাধিক মানুষ অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি আগুন দেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার গাড়িতে।

শেখ হাসিনা বলেন, “জনগণের জীবন নিয়ে কেন এই ছিনিমিনি খেলা? আমি বেঁচে থাকতে জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেব না।”

সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের সচেতনতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের চোখ খুলে গেছে।

২০ দলের কর্মসূচিতে জোটের নেতা-কর্মীদের অনুপস্থিতি এবং নাশকতার বিরুদ্ধে বিদেশিদের উচ্চকণ্ঠ হওয়ার বিষয়টি আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

“না উত্তর, না দক্ষিণ- কেউ সাড়া দেয়নি,” বিদেশিদের বিষয়টি তুলে দেশের বিষয়ে তিনি বলেন, “আন্দোলনে ব্যর্থ হয়েছে। জনসমর্থন জোগাড় করে আন্দোলন করতে পারে নাই।”

অবরোধ ও হরতালের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, “তার হরতাল তো তার দলের নিজের লোকরাই মানেন না। তাদের কল-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব খোলা। তারা গাড়িতে চলে।

“উনি স্বপ্নে বিভোর। তার এই মানুষ পোড়ানোকে দেশবাসী বাহবা দিচ্ছে। কেউ তার মাথায় ঢুকিয়েছি- উনি মহাকাজ করে ফেলেছেন।”

আন্দোলনে জনগণের সাড়া না পাওয়া ঢাকার বাইরের নেতাদের খালেদা জিয়ার ফোন করে ধমকানোর বিষয়টিও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পরই খালেদা জিয়ার পদত্যাগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সেই আন্দোলনে জনগণের জনসমর্থন ছিল।

“জনগণ রাস্তায় নেমেছিল, জনগণ খালেদা জিয়াকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।”

শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, “মিথ্যাচার দিয়েই তার (খালেদা জিয়া) বক্তব্য শুরু।”

ক্ষমতাসীনরা আন্দোলন দমনে ‘নাৎসি কায়দায়’ নিজেরা অপরাধ ঘটিয়ে বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে অভিযোগ করে খালেদা বলেছেন, “হিটলারের যেমন শেষ রক্ষা হয়নি, তার অনুসারী বাংলাদেশি ক্ষুদে হিটলাররাও চূড়ান্ত বিবেচনায় পরাজিত হবে।”

খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “উনি হিটলারের কথা বলেছেন। হিটলারের গোয়েবলস্ও (হিটলারের প্রচারমন্ত্রী) লজ্জা পেত। বলত, ওরে বাবা, এ দেখি আমার মা।”

বিএনপির যুগ্মমহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের অন্তর্ধাণেও বিএনপির হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেন সরকার প্রধান।

“সে (সালাহ উদ্দিন) কোথায়, তার জবাব খালেদা জিয়াকেই দিতে হবে। সে তো ডিপ আন্ডারগ্রাউন্ডে। ডিপ আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে একটা করে স্টেইটমেন্ট দেন। আমি যেদিন গেলাম; সেদিনও জানি, সালাহ উদ্দিন সেখানে।”

“পুলিশও তো তাকে খুঁজছে, পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে,” সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ স্পষ্টত নাকচ করলেন সরকার প্রধান।

অজ্ঞাত স্থানে থেকে হরতালের কর্মসূচি দিয়ে বিবৃতি পাঠিয়ে আসা সালাহ উদ্দিনকে গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার ও বিএনপির অভিযোগ।

সালাহ উদ্দিনকে সরকারই তুলে নিয়েছে দাবি করে খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, “সালাহ উদ্দিন আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনার দায় ক্ষমতাসীনরা এড়াতে পারে না। তাদের কোনো কৈফিয়ত কারো কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে না।”

সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের সুইপার দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় পরিষ্কার করিয়ে সেখান থেকে আটটি বড় বস্তা বের করার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “ওই ময়লার সাথে আবার বের করে দিলেন কি না? এর জবাব খালেদা জিয়াকেই দিতে হবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে খালেদা জিয়ার ক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ওনার এত রাগ কেন? তারা তো তাদের ওপর রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে। যারাই মানুষ পুড়িয়ে মারবে, তাদের বিরুদ্ধেই ববস্থা নেবে।”

সরকারকে ব্যর্থ বলে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “কিসের ব্যর্থ? ওনার মতো টাকা কামাই নাই- এটা ব্যর্থতা? ওনার মতো সন্তানদের চোর বানাই নাই।”

সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিষয়ে তথ্য নেওয়ার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে প্রবাসী বিএনপি নেতার ছেলের কারাদন্ডের রায় তুলে ধরে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার বিষয়টিও আনেন তিনি।
“আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। এখন জয়ের পিছে লেগেছে, দোষটা কী?”
‘বিএনপি-জামাত জোটের অগ্নি-পেট্রোল বোমা-জঙ্গীবাদ সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ও জাতীয় উন্নয়ন-অর্থনীতি-শিক্ষা ধ্বংসের প্রতিবাদে’ এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি বিচারপতি এ এফ এম মেসবাহউদ্দিন। পরিচালনায় ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সংগঠনের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী ও অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান, কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটের সভাপতি সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সভাপতি হাবিবুর রহমান এবং চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম ও ঢাকা বিভাগ থেকে ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি আইনজীবী আনিসুর রহমান খান বক্তব্য রাখেন।

শেয়ার