মংলায় ভবন ধস দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে ফিরছে আহতদের

mongla

সমাজের কথা ডেস্ক॥

বাগেরহাটের মংলায় নির্মাণাধীন ভবন ধসের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আহত শ্রমিকরা ভয়াল সেই দুর্ঘটনার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

ঘটনার প্রায় দুই দিন অতিবাহিত হলেও দুর্বিষহ সেই স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে তাদের। খুব কাছ থেকে সহকর্মীর মৃত্যুর দৃশ্য যারা দেখেছেন তাদের অবস্থা আরও করুণ। মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন তারা।

এমন দুই বেঁচে যাওয়া শ্রমিক মাসুম (২৮) ও আশরাফুল (৩৫)।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সেনা কল্যাণ সংস্থা পরিচালিত মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নির্মাণাধীণ ভবনের ছাদের ঢালাই চলাকালে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন খুলনা মহানগরীর বাগমারার মাসুম, আশরাফুল, আল-আমিন ও সিরাজুল। ভবন ধসের ঘটনায় মাসুম ও আশরাফুল সামান্য আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু এ ঘটনায় তাদের সহকর্মী আল-আমিন ও সিরাজুল মারা যান। আহত হন বাগমারার আরও অনেক শ্রমিক।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে খুলনার বাগমারার আনিস, সাহেব আলী গাইন, বটিয়াঘাটার নাজিম ওই দুর্ঘটনার দৃশ্য মনে করতেই আঁতকে ওঠছেন। একই অবস্থা মংলা বন্দর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিকদের। ক্ষণিকের জন্যও একা থাকতে ভয় পাচ্ছেন তাদের কেউ কেউ।

অনেকে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠছে ভয়ানক সেসব দৃশ্য। আর কোনোরকমে একটু ঘুম এলেও দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে জেগে উঠছেন তারা।

খুব কাছ থেকে সহকর্মীর মৃত্যুর করুণ দৃশ্য দেখা মাসুম ও আশরাফুল কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না সহকর্মীর এ অকাল চলে যাওয়া।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে রক্তমাখা শার্ট গায়ে কথা হয় মাসুমের সঙ্গে। ডান পায়ে আঘাত লাগায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে তার। তাতে তার দুঃখ নেই, তবু বেঁচে রয়েছেন। প্রাণ নিয়ে মা-বাবাসহ পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পেরেই ভাগ্যবান তিনি।

মাসুম বলেন, স্মৃতিকে ধরে রাখতেই রক্তমাখা শার্ট এখনও পড়ে আছি। ভবন ধসে পায়ে আঘাত লাগার পরও অনেক সহকর্মীকে উদ্ধার করেছি। কেয়ামতের মতো মনে হয়েছে সে সময়। এ কথা বলেই কেঁদে ওঠেন তিনি।

আশরাফুল বলেন, দুর্ঘটনায় আমি তেমন আহত হইনি। তবে সহকর্মীদের উদ্ধার করতে গিয়ে হাত পায়ে লোহার রড ঢুকে অনেক জায়গায় কেটে গেছে।

তিনি জানান, ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে এলিফ্যান্ট ব্র্যান্ড সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ছাদ ঢালাইয়ের সময় হঠাৎ করে ছাদটি ধসে পড়ে। এ সময় শ্রমিকদের চিৎকারে আশপাশের শ্রমিক ও স্থানীয়রা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী সদস্যরা আসার পর আমরা সেখান থেকে সরে আসি।

তিনি আরো জানান, আল-আমিন ও সিরাজুল দুইজনই তার আত্মীয় ও সহকর্মী। মিজান সরদারের নেতৃত্বে এলাকা থেকে একত্রে তারা মংলায় কাজে এসেছিলেন।

সেনা কল্যাণ সংস্থার মালিকানায় ১৯৯৪ সালে পশুর নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলিফ্যান্ট ব্র্যান্ড নামে সিমেন্ট বাজারজাত শুরু করে। কারখানাটি গুদাম নির্মাণের জন্য ১৪২ কোটি টাকায় চীনের সিএনবিএম ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়।

২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে চীনা কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ আইটিসিএল নামক অপর একটি কোম্পানি এ কাজের সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করে। চলতি বছরের ১০ নভেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা।

বাংলাদেশি এই কোম্পানি বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে। দুপুরে ভবনটি ধসে পড়ে।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে উদ্ধারকাজের সমাপ্তি ঘোষণা করেন ফায়ার সার্ভিসের খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক (ডিজি) মিজানুর রহমান।

তিনি জানান, এ দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃতদেহ ও মোট ৪৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর ওইদিন রাতে ভবন ধস সম্পর্কে আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ভবনের প্রথম তলার কাজ চলাকালীন স্কাফল্ডিংয়ের ভারসাম্য হারিয়ে ঢালাইরত অংশ ধসে পড়ে।

শেয়ার