ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম নরেন্দ্রপুর ॥ ক্রিকেট ব্যাটের ভরা মৌসুমে অবরোধে ভাটা

bat

তবিবর রহমান॥
নিবিষ্ট মনে তৈরি করা ব্যাটে স্টিকার লাগাচ্ছেন তাপসী রানী ও নার্গিস বেগম। এর একটু দূরে ব্যাট চাঁচা-ছোলা করছেন লক্ষণ কুমার, মনোরঞ্জন, রিপন হোসেন। তাদের যেন কথা বলার সময় নেই। পুরুষরা ব্যাট তৈরি করছেন। আর সেই ব্যাট ঘষে-মেজে রং লাগিয়ে আকর্ষণীয় করছেন নারীরা। এরপর স্টিকার লাগিয়ে পুরো ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার এ সময়ে ব্যাটের চাহিদা বেশি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী ব্যাট তৈরিতে তাদের মনোনিবেশ। তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে কর্মযজ্ঞ। এ ব্যস্ততা শুধু তাদের একা নয়। পুরো নরেন্দ্রপুর (মিস্ত্রিপাড়া) জুড়েই এদৃশ্য। কিন্তু কর্মব্যস্ততা থাকলেও তাদের মুখে হাসি নেই। কারণ হরতাল অবরোধে তৈরি ব্যাট বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে। তাই কারখানায় ব্যাটের স্তুপ জমছে।
যশোর শহর থেকে খুলনা রোড ধরে ১০ কিলোমিটার গেলে রূপদিয়া বাজার। এ বাজার থেকে দক্ষিণে দু’কিলোমিটার দূরত্বে নরেন্দ্রপুর গ্রাম। বর্তমানে এ গ্রামটি ‘ব্যাট তৈরির গ্রাম’ হিসেবে সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এখানকার ব্যাট সারাদেশে পাঠানো হচ্ছে। গত দু’দশক ধরে তারা এ কাজ করে চলেছেন। দিন যত যাচ্ছে; বাড়ছে ক্রিকেট ভক্ত। একই সাথে বাড়ছে ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা। তাই বাড়ছে ব্যাট তৈরির কারখানা আর কারিগর। কথা হয় মিস্ত্রি লক্ষণ কুমারের সাথে। তিনি বলেন, আগে মহাজন অর্ডার বেশি পেতেন না। দিনদিন অর্ডার বাড়ছে। তাই মিস্ত্রিদের কাজ বাড়ার সাথে সাথে উপার্জন বেড়েছে। ফলে টানাপড়েনের সংসারে এসেছে কিছুটা স্বস্তি। তিনি প্রতিদিন একশ ব্যাট তৈরি করতে পারেন বলে জানান। এ হিসেবে ২হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু সব সময় একইভাবে কাজ হয়না। বর্তমানে হরতাল অবরোধে মহাজনরা তৈরি ব্যাট পাঠাতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন। আরেক কাঠমিস্ত্রি মনোরঞ্জন বলেন, তিনি এক যুগের বেশি সময় এ পেশায় যুক্ত আছেন। এখান থেকে যে আয় হয় তা দিয়েই সংসার চালান। এ গ্রামের নারী শ্রমিক নার্গিস বেগম বলেন, স্বামীর সংসারে বাড়তি উপার্জন করতে ব্যাট রং করা ও স্টিকার লাগানোর কাজ করেন তিনি। এতে দৈনিক ৬০-৮০ টাকা আয় হয়। আরেক নারী শ্রমিক তাপসী রানী বলেন, ২০০ ব্যাট ঘঁষে দিলে মহাজন ১২০ টাকা দেন।
এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, এ গ্রামের প্রায় ৬০টি কারখানায় পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ ব্যাট তৈরির সাথে যুক্ত রয়েছেন। পুরুষ শ্রমিকরা কাঠ কেটে ব্যাট তৈরি করছেন। আর নারীরা পুটিং, ঘষা-মাজা, রং ও স্টিকার লাগাচ্ছেন। এজন্য নারীরা ১০০ ব্যাট আকর্ষণীয় করতে পাচ্ছে ৮০ টাকা। আর পুরুষ শ্রমিকরা ১০০ ব্যাট তৈরি করে পাচ্ছেন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু চলমান হরতাল অবরোধে এখানকার মহাজনরা (কারখানার মালিকরা) ঠিকভাবে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারছেন না। তারা জানিয়েছেন, দিন দিন বাড়ি ও কারখানায় ব্যাটের মজুদ বাড়ছে। কিন্তু পাইকারি ক্রেতাদের কাছে তৈরিকৃত ব্যাট পাঠাতে পারছেন না। আবার ঝুঁকি নিয়ে পাঠালেও টার্গেট অনুযায়ী বিক্রি ও টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। এভাবেই বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করলেন স্থানীয় কারখানার মালিক মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, যশোর জেলার বাইরে তারা নরেন্দ্রপুর থেকে রংপুর, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জে নিয়মিত ব্যাট পাঠাতেন। এর বাইরেও তারা বিভিন্ন জেলায় ব্যাট পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু এখন তো পাঠাতে পারছেন না বললেই চলে। তিনি আরও জানান, এখানকার কারখানার মালিকরা জাগরণী চক্র, আশাসহ বিভিন্ন বেসরকারি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে কাঠ কিনে ব্যাট তৈরি করেন। কিন্তু বিক্রি না হওয়ায় তারা ঋণের কিস্তি দিতে পারছেন না। একই কথা বলেছেন আরেক কারখানার মালিক আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিগত ১০ বছর আমি এ পেশার সাথে যুক্ত। কিন্তু এ সমস্যায় পড়িনি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিয়ে কিছু কিছু ব্যাট পাঠালেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করতে পারছেন না। তাই তারা কারখানা মালিকদের টাকাও পরিশোধ করছেন না। তিনি আরও বলেন, দূর দূরান্ত থেকে যে সব ব্যবসায়ী নরেন্দ্রপুরে ব্যাট কিনতে আসতেন তারাও এখন আসতে পারছেন না। ফলে বাড়িতে ব্যাটের মজুদ পড়ে আছে। আর বাড়ছে কারখানা মালিকদের ঋণের বোঝা।

শেয়ার