একাত্তরের ‘আরেক ফাল্গুনে’ উত্তাল যশোরের রাজপথ

jessore 7 marce
সালমান হাসান ॥
একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চে গণসংগ্রামে উত্তাল ছিল ঐতিহাসিক জেলা যশোরের রাজপথ। মার্চের গোড়ার দিকে পাকিস্তানী শাষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের আগুন ছড়িয়ে পড়ে জেলার সর্বত্র। দ্রোহের অনলে রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। সংগ্রামীজনতা রুদ্ররোষে ফেটে পড়ে মুক্তির অনাবিল হাতছানিতে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরদিন অর্থাৎ ৮ মার্চ থেকে দিকে দিকে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মুক্তির সংগ্রামের ডাক। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই গণআন্দোলন দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে যশোর থেকে প্রকাশিত গণদাবি, মাতৃভূমি ও নতুন দেশ পত্রিকা তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যায়, ৩ মার্চ সর্বদলীয় পরিষদ শহরের ঈদগাহ ময়দানে জনসমাবেশের ডাক দেয়। হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা সেই জনসমাবেশে যোগ দেন। ঈদগাহ মাঠের সে দিনের সমাবেশে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকার নকশা তৈরি করেন সৈয়দ মহব্বত আলী, অমল সোম ও মাহমুদ-উল-হকসহ কয়েকজন। পতাকাটি সেলাই করেন অমল সোমের সহধর্মীনি রেবা রানী সোম, সালেহা বেগমসহ একদল মুক্তিকামী নারী।
এদিন, সমাবেশ শেষে সংগ্রামী জনতার একটি মিছিল রেলরোড ধরে সামনের দিকে যখন অগ্রসর হচ্ছিল ঠিক তখনই পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি ছুড়লে কয়েকজন মারাত্মক আহত হন। পাক সেনাদের এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা যেন তীব্র রোষে গর্জে ওঠেন। পাক সেনাদের গুলিকে উপেক্ষা করে মিছিলে অংশগ্রহণকারী মুক্তিকামী মানুষ মারমুখী হয়ে সামনের দিকে ধাবিত হন। মিছিল শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনের সামনে পৌঁছালে পাকবাহিনী আবার গুলি চালায়। গুলিতে চারুবালা কর নামে এক বৃদ্ধা নিহত হন। তিনিই উত্তাল একাত্তরে ঐতিহাসিক যশোরের প্রথম শহীদ।
একই দিনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কালেক্টরেট ভবনে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আব্দুল হাই ট্রেজারি শাখার পাশে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে সেই পতাকা নামিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। তখন শহরে পাকিস্তানী বাহিনী এলোপাথারি গুলি ছুড়ছিল।
ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর যশোরে ‘সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। একই সময়ে গঠিত হয় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ও ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’। সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন মশিউর রহমান, রওশন আলী, মোশারফ হোসেন, নূরুল ইসলাম, তবিবর রহমান সরদার, শাহ্ হাদিউজ্জামান, পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য প্রমুখ নেতারা। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন খান টিপু সুলতান, রবিউল আলম, আব্দুল হাই, রওশন জাহান সাথী, ছালেহা বেগম, ফিরোজা বেগম, খয়রাত হোসেন, অশোক রায়, রাজেক আহম্মেদ, হায়দার গনি খান পলাশ, শেখ আব্দুস সালাম, মইনুদ্দিন, জালাল উদ্দিন রতন, আব্দুল মান্নান, হাসান শিবল ঝরণা, আলী হোসেন মনি প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। আর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতৃত্ব ছিলেন এসএম জামাল উদ্দিনসহ অন্যান্যরা।
সে সময় জেলা সংগ্রাম কমিটি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় গ্রাম পর্যায়ে কমিটি গঠন শুরু করে। সকল স্তরের কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ১১ জন। কমিটির কাজ ছিল সভা সমাবেশের মধ্যদিয়ে জনগণকে সংগঠিত করা। এ সময় বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে ছাত্র যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শহরের মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিতেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন নান্নু ও শংকরপুর ক্যাম্পে ইপিআর নায়েক সেকেন্দার আলী।
৮ মার্চ রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের পর সংগ্রামী জনতা প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সেনানিবাসে যাতায়াতের পথ বন্ধ করাসহ বিদ্যুৎ, খাবার পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেন। সেনানিবাসের বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জনগণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৩ মার্চ নিয়াজ পার্কে (বর্তমানে কালেক্টরেট পার্ক) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-জনতার প্রথম কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ মার্চ আন্দোলনকারী জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মশিউর রহমান, রওশন আলী ও মোশারফ হোসেনের বাড়িতে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক সমবেত হয়। পরে স্বাধীনতাকামী সেই জনতা সশস্ত্র অবস্থান নেয় সেনানিবাসের ফটকে। এঘটনার পর ওই দিন রাতে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকসেনারা প্রায় ৫০টি গাড়িতে শহর অভিমুখে যাত্রা করে। শহরে ঢুকে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। ২৯ মার্চ যশোর সেনানিবাসে বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সেই সেনা বিদ্রোহে ৩০০ বাঙালি সেনা শহীদ হন। লেফটেনেন্ট আনোয়ার ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

শেয়ার