খালেদার কাছে সরকারের চাওয়া কূটনীতিকদেরও জামায়াত ছাড়ুন, সন্ত্রাস বন্ধ করুন

kaleda
সমাজের কথা ডেস্ক॥
রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতকে ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে সহিংসতা ছেড়ে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি করতে হবে। না হলে সরকার আরো কঠোর হবে। সরকারের এই দুই কড়া বার্তা নিয়েই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে অবস্থিত ১৬ দেশের রাষ্ট্রদূতেরা।
কূটনীতিকেরা সরকারকে অবহিত করেই মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সেখানে গিয়েছিলেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত রোববার (১ মার্চ) সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের কাছে এমন বার্তা দেওয়া হয়। মূলত সে বার্তাই খালেদাকে পৌঁছে দিলেন কূটনীতিকরা।
সেদিন গুলশানে খালেদার কার্যালয়ে যেতে কূটনীতিকরা গাড়িতে নিজ নিজ দেশের পতাকা ব্যবহার করেননি। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রটোকল ব্যবহার করেই একসঙ্গে বিএনপি কার্যালয়ে হাজির হন তারা। নিরাপত্তার স্বার্থে এ ব্যবস্থার কথাও সরকারকে আগাম জানানো হয়েছিল।

কিছুদিন আগে ঢাকাস্থ কয়েকজন রাষ্ট্রদূত দেশের পরিস্থিতি জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনৈতিক বার্তা পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন।

ওই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা, সন্ত্রাস ও সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন কূটনীতিকরা।

‘বিএনপিকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ না দেওয়া উদ্বেগের’-একথা উল্লেখ করে শিগগিরই সহিংসতা বন্ধ হবে এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ ও রাজনীতির সুযোগ থাকবে বলে কূটনীতিকেরা আশা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের জানানো হয়, বিএনপি-জামায়াত মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র আদলে দেশে সহিংসতার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে ২০১৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সহিংসতা বন্ধে সরকার আরো কঠোর হবে। সন্ত্রাস চালানো দলগুলোকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে চলমান সংকটের সমাধানের জন্য সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে বিএনপিকে ‘সন্ত্রাসী দল’ জামায়াতকে ছাড়তে হবে। রাজনৈতিক কার্যক্রমের নামে সহিংসতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
আর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে দেখা হলে এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়। বিভিন্ন স্থানে জামায়াতকর্মীদের সহিংসতার উদাহরণ টেনে দেশের সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে সহিংসতা ছাড়তে বিএনপি-জামায়াতকে চাপ দিতে কূটনীতিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। এ সময় কূটনীতিকরা সরাসরি খালেদা জিয়ার কাছে অনুরোধ জানাবেন কি-না জানতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়।
এরপরই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ জানিয়ে চিঠি পাঠান কূটনীতিকরা। খালেদা জিয়া সরকারে বা সংসদের বিরোধী দলে না থাকায় সেটি নোট ভারবাল নয়, চিঠি হিসেবেই বিএনপির এক নেতার কাছে পৌঁছে। ওই নেতাই পরে খালেদা জিয়াকে চিঠির বিষয়টি অবহিত করে সাক্ষাতের কর্মসূচি নির্ধারণ করেন।

রোববার খালেদার কার্যালয়ে যান অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র (দক্ষিণ কোরিয়া), স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির কাছেও চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কূটনীতিকেরা। সহিংসতা বন্ধ করে জনসম্পৃক্ত ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির করার পরামর্শ দেন। বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে এ দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এহেন সহিংস অবস্থা আর দেখতে চান না।

দেশের এহেন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল বারবার সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে চলমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিঠি লিখেন। উভয়পক্ষ বান কি মুনের চিঠির জবাব দিয়েছে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকেও জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গত ২০ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নিরাপরাধ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা বা রাজনৈতিক অভিব্যক্তি দমন করার কৌশল কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।

ফেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ-কমিটির কয়েকজন সদস্য ঢাকা সফর করে গেছেন। তারা ঢাকা ছাড়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের আহবানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করে ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনের আহ্বান জানান।

২৬ ফেব্রুয়ারি কমিটির সদস্যরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সংলাপ-সমঝোতায় রাজনীতিকদের অনীহায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ইইউ-বাংলাদেশ সাব গ্রুপের বৈঠকে সহিংসতার ইস্যুিিটউঠে আসে। সহিংসতাকারীরা যেই হোক তাদের অবশ্যই চিহ্নিত করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আহবান জানায় ইইউ।

শেয়ার