ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ যশোর এমএম কলেজ॥ যুদ্ধে নিহত দু’শিক্ষক ও ছয় ছাত্রের ইতিহাস জানে না অনেকে

mmc
সালমান হাসান॥
একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ছাত্র শিক্ষকরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দীর্ঘ নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে প্রাচীন এ বিদ্যাপিঠের তৎকালীন ২ জন শিক্ষক ও ছয় ছাত্র শহীদ হন। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস অনেকেরই অজানা। দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে জীবনদানকারী এ সকল শহীদদের সম্মানে তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে কলেজ প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য চেতনায় চিরঞ্জীব নির্মিত হলেও তাদের স্মরণে আলাদা কর্মসূচি পালন করা হয় না। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আবির্ভাবের বহু বছর পরে ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এ ভাস্কর্যের নির্মাণ সম্পন্ন হলে বাঙালির আত্মবিস্মৃতির কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন হয়। কলেজ আঙিনায় গণমুখী স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতীক অনবদ্য শিল্পমণ্ডিত এ ভাস্কর্যের গায়ে মুদ্রিত রয়েছে রক্ত¯œাত স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে শাহাদৎ বরণকারী ছাত্র-শিক্ষকদের নাম। তবে এদের আত্মদানের ইতিহাস অনেকের অজানা। এ সকল শহীদদের ত্যাগের মহিমা মেলে ধরতে শুধু ভাস্কর্য নির্মাণ হলেও কলেজ প্রশাসন ইতিপূর্বে তাদের জীবনদানের ইতিহাস শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরতে উদ্যোগ নেয়নি। তবে কলেজের বর্তমান প্রশাসন এ সকল শহীদদের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে। যা আগামীতে কলেজের ওয়েব সাইটে ঠাঁই পাবে।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল পাকবাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মাইকেল মধুসূদন কলেজের (এমএম কলেজ) ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দিন আহম্মদ। যশোর শহরের ষষ্ঠিতলা পাড়ায় ম্যাজিস্ট্রেট রহমত উল্লার বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। সেই বাড়িতেই অবস্থানকালে তাকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানী বাহিনী। শহীদ এ শিক্ষক মানিকগঞ্জের (গঙ্গাধর পট্টির) নঈমউদ্দিন আহম্মদের চতুর্থ পুত্র ছিলেন। ছাত্র জীবনে তিনি অনেক মেধাবী ছিলেন। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগ থেকে ঢাকা বোর্ডে নবম স্থান অর্জন করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী রওশন আরা ও ৪ বছরের পুত্র সাঈদকে পৃথিবীতে রেখে যান। এ ঘটনার ৫ দিন পরে ৯ এপ্রিল এ কলেজের আর একজন শিক্ষক অধ্যাপক নবীন চন্দ্র ঘোষ নিখোঁজ হন। এদিন সকাল ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন কাঠের পুল থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর বিহারী ও রাজাকারদের সহায়তায় তাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর তাঁকে আর কেউ দেখেনি।
জানা যায়, শহীদ নবীন চন্দ্র ঘোষ যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের বালিয়াঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। অনেক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ১৯৬০ সালে এমএম কলেজে যোগদান করেন। বিভিন্ন সামাজিক ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথা, যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে বি.কে রোডের বাসায় অবস্থান করতেন। বাড়িতে সে সময় তাঁর ৭/৮ জন বন্ধু নিরাপদ আশ্রয় ভেবে সেখানে থাকতেন। তাঁর দৃঢ় ধারণা ছিল যে কেউ তার ক্ষতি করবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল রাজাকার ও বিহারীরা তাকে তুলে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে যায়। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তাল দিনের বিভিন্ন সময়ে এ কলেজের ভূগোল বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান, বিএ ফল প্রার্থী এসএম নজরুল ইসলাম, বিকম এর ছাত্র নিমাই চন্দ্র সাহা, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী আবু বকর, মফিজুর রহমান হেম এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শহীদ হন।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নমিতা রানী বিশ্বাস বলেন, যারা দেশের জন্য আত্মদান করেছেন তাঁরা জাতির সূর্য সন্তান। জাতির আদর্শ তারা। কলেজে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা তাদের যেন আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং তাদের জীবন ও পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পারেন এজন্য কলেজের ওয়েব সাইটে তথ্য সংযোজন করা হচ্ছে।

শেয়ার