আইসক্রিম ফ্যাক্টরিগুলোতে ‘বিষ’ বিক্রির প্রস্তুতি! ॥ যশোরে প্রায় ২০টি কারখানার টার্গেট শিশু ও স্কুল শিক্ষার্থী

Ice crime

মিলন রহমান ॥
‘বিষ’ বিক্রির প্রস্তুতি শুরু করেছে যশোরের আইসক্রিম ফ্যাক্টরিগুলো। নিম্নমানের ও ক্ষতিকর রং-উপকরণ মিশিয়ে সস্তা দামের এই আইসক্রিম বিক্রির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে ফ্যাক্টরিগুলোতে। যশোরের প্রায় ২০টি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি এ প্রস্তুতি নিয়েছে। শিশু ও স্কুল শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেই বাজারজাত করা হয় এইসব ক্ষতিকর আইসবার। যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোটা যশোর জেলায় ২০টিরও বেশি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি রয়েছে। শীত মৌসুমের তিনমাস বাদে বছরের বাকীটা সময় এই ফ্যাক্টরিগুলো আইসক্রিম উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে। এই কারখানাগুলোতে ১টাকা মূল্যের গাজর, পেপসি, লাল-সবুজ, ২/৩ টাকা দামের কুলফি, ৪/৫টাকার চকবার কুলফি ও ১০/১২ টাকা দামের চকবার আইসক্রিম তৈরি করে থাকে। যশোরের বেশ কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, সস্তা দামের এই আইসক্রিম তৈরিতে নিম্নমানের ফুড কালার ও অত্যন্ত ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সাধারণত আইসক্রিম তৈরিতে দুধ, চিনি, ঘনচিনি, কর্ন ফ্লাওয়ার, স্টাবিলাইজার, ফ্লেভার, ফুড কালার ও পানি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ১/২টাকা দামের আইসক্রিমে যে ফুড কালার ব্যবহার করা হয়-তা খাদ্য বা আইসক্রিমে ব্যবহারের অনুমোদন আছে কি না জানেন না কেউ। ভারত ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা এই ফুড কালারের কৌটায় বিএসটিআই’য়ের এ ধরণের কোনো নির্দেশনা নেই। শহরের গো-হাটা রোডের ৫টি দোকানে এই ফুড কালার বিক্রি হয়। সেখান থেকেই ফ্যাক্টরি মালিকরা এটি সংগ্রহ করেন।
আর চার থেকে ১০/১২ টাকা দামের চকবার কুলফি ও চকবার আইসক্রিম তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিস্ময়কর উপাদান। এই আইসক্রিমের চকলেটি আবরণ তৈরি হচ্ছে কাঁচা পামঅয়েল, ডালডা ও নিম্নমানের কোকো পাউডার দিয়ে। এই তিন উপকরণের ঘন সংমিশ্রন তৈরি করে তাতে আইসক্রিম ডুবিয়ে বানানো হচ্ছে চকবার আইসক্রিম। এই তিন উপকরণই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সূত্র আরও জানায়, ভাল মানের চকবার আইসক্রিম তৈরিতে মিমি চকলেট ব্যবহার করতে হয়। এতে একটি চকবারের খরচ পড়বে অন্তত ১০টাকা, আর চকবার কুলফির অন্তত ৩ টাকা। আর ক্ষতিকর ওই উপকরণ ব্যবহার করে ফ্যাক্টরি মালিকরা এই খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনেন। আর নিম্নমানের এই আইসক্রিমগুলোর অধিকাংশই তৈরি হয় রাতের আঁধারে। অনেকে সকাল হওয়ার আগেই তা ফ্যাক্টরির বাইরে বের করে দেন। যাতে কোনো ধরণের অভিযান হলেও তারা ধরা না পড়েন।
মঙ্গলবার জিলা স্কুলের সামনে চাইল্ড আইসবারে নিম্নমানের উপকরণে আইসক্রিম তৈরির ছবি তুলতে গেলে ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ দম্ভোক্তি করলেন, “সাংবাদিকদের আসার দরকার নেই, এখানে ম্যাজিস্ট্রেট আসে, আমরা টাকা দিই।”
এ ব্যাপারে কথা হয় বৃহত্তর যশোর জেলা আইস ও আইসবার প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের সাথে। তিনি স্বীকার করেন, অধিকাংশ ফ্যাক্টরি মালিকই নিম্নমানের উপকরণ ও ফুড কালার ব্যবহার করে। একরকম প্রকাশ্যেই এই আইসক্রিম বানানো হচ্ছে। কিন্তু জানতে চাইলে বা নিষেধ করলে ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে মালিকরা। যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ভেজালবিরোধী অভিযান চলে তখন কিছুদিন নীরব থাকে। তারপর আবার যা তাই। তাই ফুড কালার যেসব দোকানে বিক্রি হয়, সেখান থেকেই বন্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসও তার হিম সুপার আইসবার ফ্যাক্টরিতে ফুড কালার বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন। একই দাবি করেন, নিউ পোলার আইসবারের মালিক মাছুম মিল্লাত কচি। তিনি জানান, কেউ কেউ ওইসব উপকরণ বা ফুড কালার ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তিনি করেন না।
আর সাগর আইসবারের ম্যানেজার রাজু আহমেদ জানান, রঙিন আইসক্রিমে শিশুরা আকৃষ্ট হয় বলে অধিকাংশ মালিক তাই তৈরি করেন। রাজু দাবি করেন, রঙিন আইসক্রিম তৈরি না করায় তার এখন ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। তিনি কয়েকজন মালিককে অনুরোধও জানিয়েছিলেন, এগুলো বন্ধ করতে। কিন্তু কেউ কারো কথা শোনে না। রাজু নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেন না দাবি করে সকলকে তা বন্ধেরও আহ্বান জানান। এইসাথে শুধু ফ্যাক্টরি নয়, সরবরাহ গাড়িগুলোতেও তল্লাশির জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় কাজী ফার্মস’র বেলিসিমো ও জানজি আইসক্রিমের যশোর জেলার পরিবেশক আনন্দ দাসের সাথে। তিনি জানান, সস্তা দামের এই আইসক্রিমগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর উপকরণে তৈরি হয়ে থাকে। তাদের আইসক্রিম যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করে উৎপাদিত হয় বলে দামও তুলনামূলক বেশি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা দেছে, যশোরে অন্তত ২০টির মত আইসক্রিম ফ্যাক্টরি রয়েছে। এর মধ্যে নিউ ইগলু আইসবার, নিউ পোলার আইসবার, হিম সুপার আইসবার, সাগর আইসবার, রুচি আইসবার, বনফুল আইসবার, মুক্তা আইসবার, তপু আইসবার, চাইল্ড আইসবার, অপু আইসবার ও নিউ ফুজি আইসবার অন্যতম। এই ফ্যাক্টরিগুলোর অধিকাংশই এই নিম্নমানের সস্তা আইসক্রিম তৈরির প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। শীত চলে যাওয়ার পর ভরা মৌসুমের বাজার ধরতে ইতোমধ্যে উৎপাদনও শুরু হয়ে গেছে। আর এই আইসক্রিমগুলোর ভোক্তা হিসেবে টার্গেট করা হয় শিশু ও স্কুল শিক্ষার্থীদের। যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান জাহিদ জানান, নিম্নমানের এই সস্তা আইসক্রিম আসলে নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে কাঁচা পামঅয়েল, ডালডা খুবই ক্ষতিকর। আর ফুড কালার ও কোকো পাউডারসহ রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহারের মাত্রা ও নির্দেশনা আছে। কিন্তু এগুলো মানা হয় না। ফলে সবমিলিয়ে এই খাবারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসিডিটি, ফুড পয়জনিং, ডায়রিয়া হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হিসেবে আলসার এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীরের সাথে। তিনি জানান, সস্তাদামের এই আইসক্রিমে ক্ষতিকর দ্রব্যাদি মিশ্রনের অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। খুব শিঘ্রই এটি বন্ধে অভিযান চালানো হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাবারের সাথে কোনো ধরণের আপোষ করা হবে না।

শেয়ার