ভোমরায় রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব ॥ ফলের গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৯০ লাখ টাকা রাজস্ববঞ্চিত সরকার

vomra

আব্দুল জলিল, সাতক্ষীরা॥ ভারত থেকে ফল আমদানির নামে সাতক্ষীরার ভোমরা শুল্ক স্টেশনে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব। রাজস্ব কর্মকর্তাদের দুর্নীতি আর এর সুযোগ নেয়া ব্যবসায়ীদের কারণে এই স্টেশন থেকে সরকার শুধুমাত্র ফলের গাড়ি থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমদানিকৃত ফলের গাড়ি থেকে নিয়ম মাফিক সরকারি রাজস্ব আদায় করা হলে ভোমরা শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার কয়েকগুণ ছাড়িয়ে যেত বলে দাবি বন্দর সংশ্লিষ্টদের।
ভোমরা শুল্ক স্টেশন সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি মাসে ভোমরা শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের ফলের গাড়ি এসেছে ১০৩১ টি এবং চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত ৯৪১টি গাড়ি। এ হিসেবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৬টি ফলের গাড়ি ভোমরা বন্দরে ঢুকেছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অন্যান্য বন্দরের কার্যক্রম যেখানে কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে সেখানে ভোমরা বন্দরে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩’শ পণ্যবাহী ভারতীয় ট্রাক ঢুকছে। হরতাল-অবরোধের প্রভাবমুক্ত থাকায় ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দরের দিকে বেশী ঝুঁকছেন। ফলে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই বন্দর দিয়ে আমাদানি-রফতানি কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে ফল আমদানি। হিলি, সোনামসজিদ, তামাবিলসহ অন্যান্য কয়েকটি বন্দরে ফল আমদানি বন্ধ থাকায় ভোমরা শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০টির মত ফলের গাড়ি ঢুকছে। আর সেই সুযোগে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে যোগসাজসে ভোমরা শুল্ক স্টেশনে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা। ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে প্রতি গাড়িতে ৮ টন ফলের ওজনে কম দেখিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তারা গাড়ি প্রতি উৎকোচ নিচ্ছেন ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতি গাড়ি থেকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সূত্র জানায়, ভোমরা শুল্ক স্টেশনে প্রতিদিন ৩৬ থেকে ৪০টির মত ভারতীয় আমদানিকৃত ফলের গাড়ি ঢোকে। প্রতিটি গাড়ির ওজন ফলসহ ৩০/৩১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাক্সসহ গাড়ির ওজন ধরা হয় ৯ মেট্রিক টন। ফলে প্রতিটি গাড়িতে ফল থাকে ২১ থেকে ২২ মেট্রিক টন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সরাকরি রাজস্ব দিয়ে থাকেন মাত্র ১৪ মেট্রিক টনের। বাকী ৭/৮ মেট্রিক টন ফলের রাজস্ব দেয়া হয়না। এছাড়া প্লাস্টিক ক্যারেটের ডিউটি দেয়ার বিধান থাকলেও তা দেয়া হয় না। এজন্য রাজস্ব কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়া হয় গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৬ টি ফলের গাড়ি থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর রাজস্ব কর্মকর্তরা ঘুষ পাচ্ছেন প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। একই সাথে বন্দরে প্রবেশের সময় গাড়ির ওজন কম দেখানোর জন্য স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ পায় গাড়ি প্রতি ৮ হাজার টাকা। এভাবে ভারত থেকে ফল আমদানির নামে সাতক্ষীরার ভোমরা শুল্ক স্টেশনে চলছে রাজস্ব ফাঁকির মহোৎসব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী জানান, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্যবসায়ী ও একজন রাজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে ভোমরা শুল্ক স্টোশনে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেড। ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি নেছার উদ্দিন, সদস্য আবু মুসা, আরাফাত রহমান ও খালিদ হোসেন শান্ত এই সিন্ডিকেড পরিচালনা করে থাকেন। অনেক আগে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার দায়ে এদের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মামলাও করেছিল। বর্তমানে আবু মুসার মালিকানাধীন মেসার্স রিজু এন্টরপ্রাইজের কার্যক্রম এখনও স্থগিত রয়েছে। তিনি বর্তমানে অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে কাজ করছেন। ভোমরা শুল্ক স্টেশনে কাস্টমসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন। কাস্টমসের পক্ষে তিনিই প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার মাধ্যমে এই মোটা অংকের ঘুষের টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। একই সাথে স্থানীয় প্রশাসনের নাম করে এই সিন্ডিকেট কাস্টমস থেকে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
এদিকে ফলের গাড়িতে থেকে রাজস্ব আদায়কে কেন্দ্র করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের অন্তঃদ্বন্দ্বের জের ধরে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার সাড়ে চার ঘন্টা সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দরের সব ধরনের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও অভিযোগ ওঠে, ঘুষ নেয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে মাথা নত করতে হয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে। এছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা টাস্কফোর্সের এক সভায় ভোমরা শুল্ক স্টেশনে কাস্টমস কর্মকর্তাদের এসব দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবু। বিষয়টি মন্ত্রী পরিষদে পাঠানোর পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ওই সভায়।
ভোমরা স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনের সহকারি কমিশনার (শুল্ক) তারেক মাহমুদ জানান, ওজন কম দেখানোর জন্য গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, বন্দরের স্বার্থে পচনশীল দ্রব্য হিসাবে ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ওজন ছাড় দেয়া হয়ে থাকে মাত্র। আর্থিক সুবিধা নেয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি সময়ে ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে কখনো ভোমরা বন্দরে এতবেশী রাজস্ব আদায় হয়নি। এই ধারা অব্যহত থাকলে চলতি অর্থ বছরে ভোমরা বন্দরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কয়েক গুন বেশী রাজস্ব আদায় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বন্দরের এই স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় প্রশসানের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যহত রাখার অনুরোধ জানান।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান জানান, ভোমরা স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনে ফলের গাড়ি থেকে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি নিয়ে জেলা টাস্কফোর্সের গত সভায় আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য খুব শীঘ্রই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) অথবা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

শেয়ার