মৃত, দেশত্যাগ ও নিরুদ্দেশ কৃষকের সংখ্যা বেশি ॥ যশোরে ১৭১ কৃষকের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা আদায়ে তিন দশক ধরে ঘুরছে বিআরডিবি

BRDB
তবিবর রহমান/লাবুয়াল হক রিপন ॥
২০ থেকে ২৫ বছর আগে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন মণিরামপুরের হেলাঞ্চী গ্রামের কালীপদ মন্ডল, খিতিশ মন্ডল ও তাহেরপুর গ্রামের প্রফুল্ল কুমার দাস। চলে যাওয়ার এক দশক আগে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) অধীনে ঋণে সেচ যন্ত্র নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি। তাই স্থানীয় বিআরডিবি কর্মকর্তারা তাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে আজও খুঁজে বেড়াচ্ছেন! শুধু তাই নয়, অনেক নিরুদ্দেশ ও মৃত ব্যক্তির কাছে পাওনা আদায়েও তারা গরিব স্বজনদের প্রতিনিয়ত তাগাদা দিচ্ছে। যশোরে এরকম ১৭১ জন কৃষকের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা আদায়ে তিন দশকের বেশি সময় কর্মকর্তারা মাঠে ঘুরছেন।
বিআরডিবি সূত্র মতে, আশির দশকের শুরুতে যশোরে কৃষকদের সেচযন্ত্র ঋণ দেয়া হয়। সে সময় মেয়াদী সেচ যন্ত্রের ঋণ বিতরণ কর্মসূচির আওতায় জেলার আট উপজেলায় তিন হাজার ৬৬১ জন কৃষককে ৯ কোটি ৯৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়েছিলো। স্যালো, মিতসুবিসি, কিলোসকার, ঊষা, কবুতরসহ কয়েকটি কোম্পানির স্যালোমেশিন ও পাইপসহ স্থাপন খাতে সরকার সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে জেলায় তিন হাজার ৬৬১ জন কৃষককে এ ঋণ দেয়। এরমধ্যে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ লাখ ২৮ হাজার টাকা অনাদায়ী রয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময়ে অনাদায়ী টাকা আদায়ে সুদ মওকুফের ঘোষণা দেয় এবং মামলা দিয়ে জেল জুলুমেরও হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু গত ৩৫ বছরেও সম্পূর্ণ টাকা আদায় করা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণ গ্রহীতার বেশির ভাগ মারা গেছেন। অনেকে নিরুদ্দেশ, কেউ কেউ ভারতে চলে গেছেন। এ অবস্থায় টাকা আদায় অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আসল আদায়ে কয়েকগুণ হওয়া সুদ মওকুফের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এতেও কাজের কাজ হয়নি। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনাদায়ী রয়েছে মণিরামপুর উপজেলায়। এ উপজেলায় কৃষকদের কাছে পাওনা রয়েছে ২৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এ টাকা আদায়ে বিআরডিবি কর্মকর্তারা ছাড়াও সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টরা মিটিং-সিটিং করছেন।
মণিরামপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা অনুপম দাস বলেন, উচ্চ পর্যায় থেকে তাদের টাকা আদায়ে গত তিন দশক ধরেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা অনেকে মারা গেছেন। তাদের স্বজনরা অনেকে মারা গেছেন। যারা বেঁচে আছেন তারা অত্যন্ত গরিব। দিনমজুর। ফলে টাকা দেয়ার সামর্থ নেই বলে তারা আকুতি মিনতি করেন। একই কথা বলেছেন যশোর সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসের পরিদর্শক ইমদাদুল হক। তিনি জানান, সদর উপজেলার কাবিলা গ্রামের আবু শ্যামার কাছে ৩৪ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। তিনি অনেক বছর আগে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে চলে যান। পরে সেখান থেকে মাগুরা জেলার সীমাখালীতে বসবাস করছেন বলে তারা শুনেছেন। তার সঠিক ঠিকানা না জানায় তাগাদাই দেয়া যায় না। সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের আবদুর রশিদ। তিনি ঋণ নেয়ার দু’বছরের মাথায় মারা গেছেন। তার কোন সন্তান, স্ত্রী কিংবা স্বজন নেই। কিন্তু টাকা আদায়ের জন্য ঘুরঘুর করতে হচ্ছে। একই গ্রামের আকরাম হোসেন অনেক আগে মারা গেছেন। তার স্ত্রী, সন্তান কোথায় কেউ তা বলতে পারে না। তার কাছে সুদ বাদেই পাওনা ৩৩ হাজারের কিছু বেশি টাকা। এসব টাকা আদায়ে তাদের কাছে উচ্চ পর্যায় থেকে তাগিদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তারা আন্তরিক হলেও আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিআরডিবি যশোরের উপ-পরিচালক শামছুর রহমান বলেন, তারা সরকারের নির্দেশ মোতাবেক আদায়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঋণ গ্রহীতাদের না পাওয়ায় টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা দেশ ত্যাগ করেছে তাদের সম্পত্তি কারা কিনেছে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে টাকা আদায়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

শেয়ার