চিরদিনের উত্তম-সুপ্রিয়া

Uttam Supriya
সমাজের কথা ডেস্ক॥ বড় প্রেম দূরে ঠেলে দেয় –কথাটি যেমন অনেক ক্ষেত্রে সত্যি তেমনি সব বাধা পায়ে দলে কাছে টেনে আনে দুজন মানুষকে –সেটিও সত্যি।

ভালোবাসার মানুষকে আপন করে নেওয়ার পথে সমাজ, সংসারের কোনো বাধাই মানেননি মহানায়ক। লোকনিন্দা, অপবাদ সবকিছু মাথা পেতে নিয়েও জীবনের সতেরটি বছর একসঙ্গেই বসবাস করে গেছেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। আইনত বিয়ে করতে পারেননি কিন্তু বিবাহিত দম্পতির মতোই পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন তারা।

উত্তম কুমার তার অভিনয়, নায়কোচিত সৌষ্ঠব ও তারকাদ্যূতিতে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ আসনটি দখল করে আছেন। ১৯২৪ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই মহান অভিনেতার জন্ম। চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ১৯৪৮ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন একই পাড়ার মেয়ে ও বান্ধবী গৌরী দেবীকে। তিনি তখন আলিপুর ডকে চাকরি করতেন। গৌরীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা। অন্যত্র তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনে ঝোঁকের মাথায় হুট করেই পালিয়ে বিয়ে করেন তাকে। ১৯৫০ সালে তাদের একমাত্র সন্তান গৌতমের জন্ম হয়।

অরুণ(উত্তম কুমার) অভিনয় করুক এটা খুব একটা পছন্দ করতেন না গৌরী দেবী। কিন্তু অভিনয়ের নেশা ছিল তার রক্তে। তাই পাড়ার থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করে অনেক সংগ্রামের পর নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন উত্তম কুমার। জনপ্রিয়তা পান আকাশচুম্বী। তবে খ্যাতি পেলেও দাম্পত্য জীবনে সুখি ছিলেন না তিনি। কারণ গৌরী দেবী তার শিল্পী সত্তার তেমন কোনো মূল্য দিতেন না। উত্তমকুমার একটি স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন কোনো নতুন ছবির চুক্তিপত্রে সই হলে সে কথা যখন তিনি ঘরে ফিরে বলতেন তখন চরিত্র বা গল্প সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করার আগে প্রথমেই তার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কত দেবে?’ নায়ক উত্তমের পাশে গৌরী ছিলেন নিতান্তই সাদামাটা এবং ঘর সংসারের বাইরে অন্য কিছু তিনি বুঝতেন না বা বুঝতে চাইতেনও না। দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব দিন দিন বাড়তে থাকে। দাম্পত্য জীবনে অসুখি উত্তম তাই ছবির জগতেই খুঁজে নেন নিজের বন্ধু-বান্ধব।

অভিনয় জীবনের প্রথমদিকে যখন একের পর এক ছবি ফ্লপ হচ্ছে তখন ‘বসু পরিবার’ সিনেমায় এক যৌথ পরিবারের আদর্শবাদী বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সিনেমায় সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন তার বোনের ভূমিকায়। এটিই উত্তম-সুপ্রিয়া অভিনীত প্রথম ছবি।

সুপ্রিয়া দেবী ‘মিরাক্কেল আক্কেল চ্যালেঞ্জাসর্’ অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণে বলেন, এগারো বছর বয়সে কলকাতার গিরীশ মুখার্জি রোডে তিনি উত্তম কুমারকে প্রথম দেখেন সতেরো-আঠারো বছরের এক তরুণ হিসেবে। তিনি ছিলেন ওর বড় ভাইদের বন্ধু। সুপ্রিয়া ( ডাক নাম বেণু, পারিবারিক নাম কৃষ্ণা) তখন থাকতেন তার বাবার কর্মস্থল বার্মায় (এখন মিয়ানমার)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বোমাবাজির ভয়ে সব সম্পদ ত্যাগ করে উদ্বাস্তু হয়ে তার পরিবার চলে আসেন কলকাতায়। ‘বসু পরিবার’ ছবিতে অভিনয় করার পর ১৯৫৪ সালে তার বিয়ে হয়ে যায় বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে।বিয়ের পর অভিনয় ছেড়ে দেন তিনি। কিন্তু বিশ্বজিতের সঙ্গে তার দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি। একমাত্র সন্তান সোমার জন্মের পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তিনি আবার রূপালিভুবনে ফিরে আসেন।

১৯৬০ সালে মুক্তি পায় উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির ব্যবসাসফল ছবি ‘শুন বরনারী’। সহশিল্পী হিসেবে দুজন মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব।দুজনেরই ব্যক্তি জীবনের শূন্যতা থেকে হয়তো, জন্ম নেয় প্রেম। এই প্রেম ছিল পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। উত্তমের ওপর সব কিছুর জন্যই ভীষণভাবে নির্ভর করতেন সুপ্রিয়া। অনেক সময় একসঙ্গে শুটিংয়ে যাওয়া-আসা করতেন তারা। এই নিয়ে গৌরী দেবীর সঙ্গে উত্তম কুমারের দাম্পত্য কলহ চরম আকার ধারণ করে। অন্যদিকে সুপ্রিয়ার মধ্যে তিনি খুঁজে পান বিশ্বস্ত বন্ধু, নির্ভরযোগ্য সহকর্মী এবং তার শিল্পী সত্তার অনুরাগীকে।

১৯৬৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর গিরীশ মুখার্জি রোডের পৈতৃক বাসভবন থেকে উত্তম কুমার চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা রোডের ফ্ল্যাটে। জীবনের বাকি সতেরটি বছর তিনি সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেই অতিবাহিত করেন। কেমন ছিল তাদের জীবন? সুপ্রিয়া দেবী তার স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন আমার উত্তম’-এ সেকথা অনেকভাবেই বলেছেন। তার ভাষ্যে জানা যায়, ১৯৬২ সালের ২রা ডিসেম্বর তাদের বিয়ে হয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায়। বিয়েতে সুপ্রিয়ার বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উত্তম কুমারের কয়েকজন বন্ধুও ছিলেন। ৫ই ডিসেম্বর তারা বিবাহত্তোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যেখানে চলচ্চিত্র জগতের প্রচুর অতিথির সমাগম হয়। তবে গৌরী দেবীর সঙ্গে আইনগতভাবে বিচ্ছেদ না হওয়ায় তারা রেজিস্ট্রি করতে পারেননি। স্বামী হিসেবে উত্তম নাকি ছিলেন খুব রোমান্টিক এবং কখনও কখনও বেশ ঈর্ষাকাতর। উত্তমের বারণ মেনেই হিন্দি ছবির জগত ত্যাগ করেন সুপ্রিয়া। বাড়িতে প্রযোজক ও পরিচালকদের বেশি আসা-যাওয়া এবং সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে আড্ডা একেবারেই পছন্দ করতেন না তিনি। তবে উত্তমের নারী সহকর্মী, ভক্ত কিংবা উঠতি নায়িকাদের মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাতেও ঈর্ষা বোধ করতেন না সুপ্রিয়া। কারণ তিনি জানতেন উত্তম এদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। এমনকি সুচিত্রা সেনকেও ঈর্ষা করেননি। পর্দায় সুচিত্রা-উত্তমের রোমান্টিক দৃশ্য দেখেও তিনি বুঝতেন সেটা নিছক অভিনয়।

মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর সেরা পথ নাকি পাকস্থলীর ভিতর দিয়ে। এটা সুপ্রিয়া দেবীর বেলায় খুব সত্যি। নিত্য নতুন রান্না করতে ভালোবাসতেন তিনি। আর মহানায়ক ভালোবাসতেন সেসব খেতে। সুপ্রিয়ার হাতের রান্নার দারুণ ভক্ত ছিলেন তিনি।

বিয়ের পরও অনেক ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন তারা।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির মতো না হলেও উত্তম-সুপ্রিয়া জুটিও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। উত্তম-সুপ্রিয়া অভিনীত ‘চিরদিনের’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘লাল পাথর’, ‘শুন বরনারী’, ‘মন নিয়ে’, ‘শুধু একটি বছর’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ইত্যাদি সিনেমা ব্যবসাসফল হওয়ার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পায়। বিশেষ করে ‘চিরদিনের’ উত্তম-সুপ্রিয়া অভিনীত দারুণ রোমান্টিক ছবি।

উত্তমের জীবনে সুপ্রিয়া ছাড়া আর কোনো নারী যেমন ছিলেন না, তেমনি সুপ্রিয়ারও জীবনে আর কোনো প্রেম আসেনি। ১৯৮০ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর থেকে এখনও একাই পথ হাঁটছেন সুপ্রিয়া দেবী। যৌথ জীবনে আনেক অপবাদ ও লোকনিন্দা সহ্য করতে হয়েছে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীকে। কিন্তু তাদের প্রেম যে সত্যিই চিরদিনের তা সময়ের কষ্টি পাথরে প্রমাণিত হয়েছে।

শেয়ার