সংসারের ঘানি টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন গ্রাম্য পুলিশ সদস্যরা ॥ মণিরামপুরে কর্মরতদের পরিবারে শুধুই হতাশা

police
মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর॥ ইউনিয়ন পরিষদের ঘর ঝাড়– দেয়া থেকে শুরু করে পরিষদ পাহারা, গ্রামের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নজরদারি, জন্মমৃত্যুর নিবন্ধন, অপরাধ বিষয় উৎঘাটন ও অপরাধী গ্রেফতারে পুলিশকে সহযোগীতা, গ্রামের গোলমালের আগাম বার্তা সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করা, রাজস্ব আদায়, সমনজারিসহ নানা ধরনের খবরা-খবর রাখতে হয় গ্রাম্য পুলিশদের। অথচ পরিবার-পরিজনের দেখভাল তো দূরের কথা তাদের মুখে দু’বেলা-দু’মুঠো অন্ন জুগিয়ে সাধারন জীবন যাপন করা তাদের দূরূহ ব্যাপার। যে বেতন পায় তারা তা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করা যেন তাদের কাছে বিলাসিতা। এত কিছুর পরেও তারা স্বপ্ন দেখে সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করে তুলবে। এতে করে সন্তান মস্তবড় অফিসার হয়ে সংসারের অভাব অন্টন ঘুচাবে কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। স্বপ্ন যেন তাদের কাছে অধরায় থেকে যাচ্ছে। কয়েকবার পদবী পরিবর্তন হলেও আজও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন মনিরামপুর উপজেলার সদর ই্উনিয়নের দফাদার ও যশোর জেলা গ্রাম্য পুলিশ কমিটির সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন। শুধু ইব্রাহিম নয়, তার মত এ উপজেলায় কর্মরত গ্রাম্য পুলিশসহ সারা দেশের গ্রাম্য পুলিশদের জীবন জীবিকা নির্বাহে অতি মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তাদের কাজের পরিধি বাড়লেও বাড়েনি তাদের বেতন-ভাতা।
জানাযায়, ১৭০৬ সালে শের শাহ’র আমলে বিচার কার্য পরিচালনায় সহযোগীতার জন্য তরফদার ও মহল্লাদের নিয়ে এ বাহিনী সূচনা হয়। পরে তারা চৌকিদার ও দফাদার বলে পরিচিত হন। ১৮৭০ সালের গ্রাম চৌকিদারী আইনে ইউনিয়ন পর্যায়ে চৌকিদারী পঞ্চায়েত গঠন করা হয়। ১৯৫৯ সারে মৌলিক গনতন্ত্র আদেশে ইউনিয়ন পরিষদের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পাহারা-টহলদার, কর আদায় ইত্যাদি ক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশ রাখা হয়। মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিস সূত্রে জানাযায়, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে ১’শ ৪৮জন গ্রাম্য পুলিশ রয়েছে। এরা ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কাজে সাহায্য প্রদান ছাড়াও অপরাধের তদন্ত, অপরাধ সম্পর্কে তথ্য আদান প্রদান, ইউনিয়ন পরিষদ পাহারা, জন্ম মৃৃৃৃত্যুূর খবরা খবর রাখা। প্রশাসনের বড় কর্মকর্তার আগমন-নির্গমন, পলাতক আসামির খোঁজ-খবর রাখা ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিডি চাল-গম বিতরণসহ সরকারী নানা কর্মকান্ডের সাথে নিজেদেরকে সংশ্লিষ্ট রাখতে হয়। সুত্রমতে, ১৯৬৮ সালে চৌকিদার ও দফাদারের বেতন ছিল যথাক্রমে ৭০ টাকা ও ৮০ টাকা। দেশ স্বাধীনের পর তাদের বেতন নির্ধারন করা হয় যথাক্রমে ২’শ ও ২২০ টাকা। ১৯৮৫ সালে বেতন নির্ধারন করা হয় যথাক্রমে ৭’শ ও ১’হাজার টাকা। ওই বছর থেকেই তাদের উৎসব ভাতা চালু হয়। বর্তমানে গ্রাম্য পুলিশদের দফাদার ও মহল্লাদার নামে ২ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের বেতন যথাক্রমে ২’হাজার ১’শ ও ১৯’শ টাকা। উপজেলা গ্রাম্য পুলিশের উপজেলা কমিটির সভাপতি মহাশিন আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, যে বেতন পায় তা দিয়ে পরিবার-পরিজনের মুখে দু’বেলা- দু’ মুঠো অন্ন যোগানো দূরূহ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের মহল্লাদার রমজান আলী বলেন, যে বেতন পায় তা দিয়ে সংসারের ব্যয়-ভার মিটিয়ে সন্তান- সন্ততিদের লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন দেখাটা যেন তাদের কাছে বিলাসিতা। উপজেলার ভোজগাতী ইউনিয়নের মহল্লাদার আনিচুর রহমান বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দফাদার ও মহল্লাদারদের অবসরকালীন ভাতা যথাক্রমে ৬০ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। এর অর্ধেক সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ দিবে এবং বাকী অর্ধেক সরকারী বরাদ্ধ থেকে দেয়ার সিন্ধান্ত থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ অর্ধেক টাকা দিলেও বাকী অর্ধেক আজও পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে সময় উপযোগী একটি বেতন কাঠামো নির্ধারন করা হলে তারা সাধারন ভাবে জীবন যাপন করতে পারত বলে তাদের দাবী।

শেয়ার