যুদ্ধাপরাধী জব্বারের আমৃত্যু কারাদণ্ড

trybuna
সমাজের কথা ডেস্ক॥ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার রাজাকার নেতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা বনে গিয়েছিলেন তিনি; একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে সেই আবদুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছে আদালত।
যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম মঙ্গলবার পলাতক এই যুদ্ধাপরাধীর সাজা ঘোষণা করেন।
রায়ে বলা হয়েছে, জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
চারটি অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ- এবং একটিতে ২০ বছরের সশ্রম কারাদ- ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও দেশান্তরে বাধ্য করার মতো যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ তিনি করেছেন তাতে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ই প্রাপ্য হলেও বয়স বিবেচনায় আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়েছে বলে আদালত বলেছে।
এর আগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের ইসলামীর ‘গুরু’ গোলাম আযমকেও বয়স বিবেচনায় ৯০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছিল, যিনি রায় ঘোষণার এক বছরের মধ্যেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আনুমানিক ৮০ বছর বয়সী জব্বার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন বলে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধে জব্বারকেই প্রথম কারাদ-ের পাশাপাশি অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। পলাতক এই যুদ্ধাপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
রায় ঘোষণার সময় এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হকও উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার একাত্তরে ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা। পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়ায় রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি যে সব অপরাধ ঘটিয়েছিলেন, তা উঠে এসেছে এই রায়ে।

প্রসিকিউশনের আনা ১ নম্বর অভিযোগ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ফুলঝুড়িতে দুইজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা, নাথপাড়া ও কুলুপাড়ার শতাধিক বাড়িতে লুট ও অগ্নিসংযোগ; ২ নম্বর অভিযোগ ফুলঝুড়িতে একজনকে হত্যা এবং ৩৬০টি বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ; ৩ নম্বর অভিযোগ-নলীতে ১১ জনকে হত্যা, ৬০টি বাড়ির মালামাল লুট ও অগ্নিসংযোগ এবং পঞ্চম অভিযোগ আঙ্গুলকাটা এবং মঠবাড়ীয়া থেকে ৩৭ জনকে আটক, মালামাল লুট, অপহরণ, নির্যাতন, ১৫ জনকে গুরুতর জখম এবং ২২ জনকে হত্যার জন্য জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আর চতুর্থ অভিযোগ- ফুলঝুড়িতে প্রায় দু’শ নিরস্ত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের লোককে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার জন্য জব্বারকে ২০ বছরের কারাদ- এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ না দিলে আরো দুই বছর কারাদ-ের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করা যাবে। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে জব্বারকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত আসা ১৭টি রায়ের মধ্যে চারটি মামলায় মোট পাঁচজন পলাতক আসামির সাজার আদেশ হলো।
ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার এবং নবম রায়ে একাত্তরের দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ফাঁসির আদেশ আসে।
আর দ্বাদশ রায়ে ফরিদপুরের বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারেরও সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হয়। পলাতক থাকায় এই চারজনের কেউ আপিলের সুযোগ পাননি।

কে এই জব্বার : পেশায় প্রকৌশলী আব্দুল জব্বার ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে’ চেয়ারম্যান- মেম্বারদের ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে স্বাধীনতার জন্য বাঙালির সংগ্রাম যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত, তখনও মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসাবে মঠবাড়িয়া-বামনা-পাথরঘাটা আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর জব্বার সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেন। প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে তাকে পরিচিত করিয়ে দেয় সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার রাজাকারদের ‘রিং লিডার’ হিসাবে।

প্রসিকিউশনের নথিতে বলা হয়, জব্বারের শ্বশুর ছিলেন পিরোজপুরের মুসলিম লীগের নেতা। শ্বশুরের হাত ধরেই একাত্তরে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম দমনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে শান্তি কমিটি গঠন করা হলে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন জব্বার।

১৯৭১ সালে এক জনসভায় জব্বার বলেছিলেন “মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দুদের স্থান এই পাকিস্তানের মাটিতে হবে না, হিন্দুদের সম্পদ সব গনিমতের মাল, সব কিছু মুসলমানদের ভোগ করা জায়েজ।”

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জব্বার আত্মগোপনে চলে যান। স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরা জিয়াউর রহমানের আমলে আবার রাজনীতি করার সুযোগ পেলে জব্বারও সক্রিয় হন।

১৯৮৬ সালে তিনি যোগ দেন সেনা শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে; পিরোজপুর-৪ আসন থেকে হন সাংসদ। ১৯৮৮ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে টিন ও চাল আত্মসাতের মামলা হয়। মামলা এড়াতে তিনি বিএনপিতে যোগ দিলেও ২০০১ জাতীয় পার্টিতে ফেরেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যানও হন।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম একাত্তরের শীর্ষ ৫০ যুদ্ধাপরাধীর একটি তালিকা করেছিল, যাতে আব্দুল জব্বারের নামও ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিনোদ বিহারী বিশ্বাসের ছেলে যজ্ঞেস বিশ্বাস ১৯৭২ সালে জব্বারের বিরুদ্ধে একটি মামলা করলেও পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে পট-পরিবর্তনের পর তা ধামাচাপা পড়ে যায়।

মামলার পূর্বাপর : ২০১৩ সালের ১৯ মে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে গতবছর ২৯ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।

যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৪ সালের ১১ মে ট্রাইব্যুনালে ৭৯ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন এ মামলার প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জাহিদ ইমাম। অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল ১২ মে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জব্বারকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় নিয়ম অনুযায়ী তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তাতেও তিনি হাজির না হওয়ায় গতবছরের ৮ জুলাই তাকে ‘পলাতক’ ঘোষণা করে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

বিচার চালাতে রাষ্ট্রীয় খরচে জব্বারের পক্ষে আইনজীবী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয় মোহাম্মদ আবুল হাসানকে। যুদ্ধাপরাধের পাঁচ ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ১৪ অগাস্ট আব্দুল জব্বারের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৪ জন সাক্ষ্য দেন। তবে জব্বার পলাতক থাকায় তার পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিল না।

দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গতবছর ৩ ডিসেম্বর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে আদালত।

শেয়ার