বেনাপোলে দু’বাংলার বাংলাভাষীদের মিলনমেলা ॥ স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা আমরা ভুলবো না- ইসমাত আরা সাদেক ॥ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দু’দেশের সম্পর্ক বটবৃক্ষে রূপ নেবে-শাহীন চাকলাদার

shahin vhi
বেনাপোল প্রতিনিধি॥ ওপারে ভারতের পশ্চিমবাংলা। এপারে বাংলাদেশ। যার আকাশ; বাতাস, ভাষা সংস্কৃতি একই। মাঝখানে শুধু তারকাঁটার বেড়া দিয়ে দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে এ দু’বাংলার মানুষদের। কিন্তু এ তারকাঁটার বেড়া মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলা ভাষাভাষীদের আটকাতে পারেনি। ভৌগলিক সীমারেখা ভুলে তারা শনিবার মিলিত হয়েছিলেন একমঞ্চে। গাইলেন বাংলার জয়গান। সুখ-দুঃখে একে অপরের সঙ্গী হওয়ার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন।
এদিন সকাল ৯ টায় বেনাপোলে সামিল হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতি প্রিয় মল্লিক। তার সাথে এসেছিলেন রাজ্যসভার বনগাঁ অঞ্চলের বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সভাধীপতি রহিমা খাতুন ও বনগাঁ পৌর মেয়র জোসনা আঢ্যসহ অতিথিরা। বাংলাদেশের পক্ষে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার, যশোর জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সহ সম্পাদক আব্দুল মজিদ, শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফুল আলম, বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী আব্দুল জব্বারসহ নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা তাদের শুভেচ্ছা জানান। ভারতের অতিথিরা এলে বাংলাদেশের সীমানায় পা দিলে নোম্যান্সল্যান্ডে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেয় একে অপরকে। পরে বেনাপোলে নোম্যান্সল্যান্ডের অস্থায়ী শহীদ মিনারের বেদিতে উভয় দেশের মানুষ ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানান এবং দু’দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বলেন, ৫২ এর ভাষা সংগ্রামের পথ ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সে জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বৃটিশরা আমাদের বাংলা ভাষাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, এদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। ভাষা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের দুই দেশের মধ্যে উপস্থিত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিতকে আরো শক্ত করবে। দু’বাংলার মানুষের জন্য অবিলম্বে ভিসা প্রথা তুলে দিয়ে পাসপোর্টের মাধ্যমে আসা যাওয়ার পদ্ধতি চালুর জোর দাবি জানান দু’দেশের সরকারের কাছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লি¬ক বলেন, আপনারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাষা আর স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগের নজির পৃথিবীতে অন্য কারও নেই। এ জন্য আপনারা গর্বিত জাতি। ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি একুশ উদযাপন করতে। দু’বাংলার মানুষ একসাথে মাতৃভাষা দিবস পালন করছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। দু’বাংলার মানুষের মিলনমেলার মধ্য দিয়ে দু’দেশের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে।
অনুষ্ঠানে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ক নতুন কোন বিষয় নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন তখন ভারত সমর্থন করেছে। বাংলাদেশের বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা করেছে ভারত। এজন্য বঙ্গবন্ধু বারবার ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সাথে এক হয়ে কাজ করছে। শাহীন চাকলাদার বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বঙ্গবন্ধু যে বন্ধুত্বের বীজ বপন করেছিলেন সেটা এখন পত্র পল্লবে বিকশিত হয়েছে। এটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বটবৃক্ষে রূপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, ভাষার কাছে কোন সীমান্ত গেট তুচ্ছ। দেশ জনতা ও ভাষাপ্রেমী মানুষ আজ মায়ের ভাষা বাংলা ও নাড়ির টানে ছুটে এসেছে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে। এ আকুতি ভুলার নয়। ভুলা যায়না।
এদিকে, দুপুরে ভারতীয় মন্ত্রী ও একুশ উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অতিথিদের সাথে করে নিয়ে যান পেট্রাপোল সীমান্তে নির্মিত একুশে মঞ্চে। সেখানে আলোচনা সভায় দু’দেশের মাতৃভাষা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দসহ অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
উভয়মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃত্তি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী আব্দুল জব্বার, আবৃত্তি শিল্পী ভাস্কর বঙ্গোপ্যাধায়, কবি আব্দুল আজিজ সংঙ্গীত আবৃত্তি ও কবিতা পাঠ করেন। প্রসঙ্গত, ২০০২ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল চেকপোস্টের জিরো পয়েন্টে মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছে দু’বাংলার মানুষ। প্রতিবারের মতো এবারও বেনাপোলে আসা ভারতের কলিকাতা বেলঘরি ও গোপালনগর গ্রামের মিনা রায় ও সবিতা রায়, বনগাঁর রিতা তালুকদার বলেন, বাংলা ও বাঙালি আজ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এ যেন নাড়ির বন্ধন। হাবড়া ও বারাসাত থেকে আসা রহিত মন্ডল ও মনিরা রায় বলেন, আমরা চেকপোস্টের ২১ অনুষ্ঠানে এসে অন্য একটি ভুবন পেয়েছি। কোন ভেদা ভেদ নেই এখানে। তারা এই দিনে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করেন।

শেয়ার