পদ্মায় লঞ্চডুবি : ৪১ জনের লাশ উদ্ধার

lonce dubi
সমাজের কথা ডেস্ক॥ পাটুরিয়ায় মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় পদ্মায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ৪১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ওসি রকিবুজ্জামান জানান, রোববার দুপুর ১২টার দিকে পাটুরিয়ার ঘাট থেকে দৌলতদিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার পরপরই মাঝনদীতে দুর্ঘটনায় পড়ে এমএল মোস্তফা-৩ নামের লঞ্চটি।
এ ঘটনায় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো জাহাজ এমভি নার্গিস-১ এর চালকসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা কে এম তারিক জানান, রাত পর্যন্ত নদীতে তল্লাশি চালিয়ে ৪১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা। নিহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি, তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস বলেন, “এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চটি সনাক্ত করে টেনে তোলার চেষ্টা হচ্ছে।”
ঠিক কতজন যাত্রী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পুলিশ তা জানাতে না পারলেও কমফোর্ট লাইন ও রাজধানী এক্সপ্রেস নামে দুটি বাসের শতাধিক আরোহী নিয়ে লঞ্চটি পাটুরিয়া ছেড়েছিল বলে ঘাটের সুপারভাইজার জুয়েল রানা জানিয়েছেন।
নগরবাড়ী থেকে ঢাকাগামী একটি কার্গো জাহাজ লঞ্চের মাঝামাঝি অংশে ধাক্কা দিলে ডান দিকে কাত হয়ে সেটি ডুবে যায়।
লঞ্চডুবির পরপরই আশেপাশের লোকজন নৌকা ও ট্রলার নিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। এ সময় বেশ কিছু যাত্রী সাঁতরে অন্য লঞ্চ ও ট্রলারে উঠতে সক্ষম হন।
গোপালগঞ্জের কমফোর্ট লাইনের সুপার ভাইজার সাখাওয়াত হোসেন জানান, সকাল ৯ টার দিকে ঢাকার গাবতলী থেকে ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে তিনি গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ থেকে যাত্রীদের উদ্ধারের পর ৩৩ জনকে নিয়ে অন্য একটি বাসে করে তিনি বিকাল ৫টায় গোপালগঞ্জে পৌঁছান।

বেঁচে যাওয়া লঞ্চযাত্রী স্বপ্না বেগম (২৫) বলেন, “সবার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। বেঁচে ফিরতে পারব বলে বিশ্বাস হচ্ছিল না।”
গোপালগঞ্জ কমফোর্ট লাইনের ম্যানেজার হামিদুর রহমান টিটো বলেন, “নিখোঁজদের জন্য আমরা নদীর তীর, শিবালয় ও মানিকগঞ্জ হাসাপাতালে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।”
রাজধানী এক্সপ্রেসের কতজন যাত্রী ওই লঞ্চে ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কতজন এখনো নিখোঁজ তা জান যায়নি।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা জানান, বিআইডব্লিউটিসির একটি টাগবোট ডুবে যাওয়া লঞ্চটির অবস্থান সনাক্ত করে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। মানিকগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি এবং পাটুরিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ও দৌলতদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তমও দুর্ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান খন্দকার শাসুদ্দোহা জানান।
বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন জানান, “নদীতে ২০ ফুট পানির নিচে এমএল মোস্তফার অবস্থান সনাক্ত করা হয়েছে। লঞ্চটির ওজন প্রায় ৫০ টন। রুস্তম পৌঁছানোর পর সেটি টেনে তোলা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।”
উদ্ধার কাজের তদারক করতে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকেও প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া ২০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস, পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে রয়েছেন। পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খোলা হয়েছে দুটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
শিবালয় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় যাদের উদ্ধার করা হচ্ছে তাদের তাৎক্ষণিক সেবা দিতে ঘটনাস্থলে একটি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে।

শিবালয় থানার ওসি রকিবুজ্জামান জানান, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো জাহাজ এমভি নার্গিস-১ এর চালকসহ তিনজনকে ঘটনার পরপরই আটক করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে নৌ-মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান জানিয়েছেন।
তবে নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নুরুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি স্থায়ী তদন্ত কমিটিও বিষয়টি তদন্ত করবে।
মানিকগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন শাহজাহানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে এই কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার