যুদ্ধাপরাধী সুবহানের প্রাণদণ্ড

Subhan
সমাজের কথা ডেস্ক॥ একাত্তরে যার নেতৃত্বে রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী পাবনায় ব্যাপক হারে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছিল, সেই জামায়াত নেতা আব্দুস সুবহানের সর্বোচ্চ সাজার আদেশ দিয়েছে আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বুধবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
প্রসিকিউশনের আনা নয়টি অভিযোগের মধ্যে ছয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে সুবহানের দ- কার্যকর করার আদেশ দেন তিনি।
একাত্তরে পাবনায় সুবহানের কর্মকা-ের জন্য তাকে একজন ‘অতি কুখ্যাত’ ব্যক্তি হিসাবে উল্লেখ করে বিচারক বলেন, এই জামায়াত নেতা ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে সে সময় ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলামও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহান পাকিস্তান আমলে তিনি ছিলেন পাবনা জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য।
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে সুবহান পাবনায় হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করেন বলে এ মামলার বিচারে উঠে এসেছে।
সুবহান হলেন জামায়াতের নবম শীর্ষ নেতা, যিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন।
এ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান যখন ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার পড়া শুরু করেন তখন সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি ও খাঁকি রঙের হাফ স্যুয়েটার পরিহিত সুবহানকে কাঠগড়ায় রাখা চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়।

প্রসিকিউশনের আনা ১ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বের করে ২০ জনকে হত্যা; ৪ নম্বর অভিযোগে সাহাপুর গ্রামে ছয়জনকে হত্যা এবং ৬ নম্বর অভিযোগে সুজানগর থানার ১৫টি গ্রামে কয়েকশ মানুষকে হত্যার দায়ে সুবহানকে দেওয়া হয় মৃত্যুদ-।
২ নম্বর ও ৭ নম্বর অভিযোগে পাকশী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম এবং সদর থানার ভাড়ারা গ্রামে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে চালানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দেওয়া হয় আমৃত্যু কারাদ-।
এছাড়া ৪ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদীর সাহাপুর গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সুবহানকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদ-।
প্রসিকিউসন ৫, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে সুবহানকে খালাস দিয়েছে আদালত।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ শিপন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আদালত বলেছে- যে অপরাধগুলো তৎকালীন পাবনায় সংঘটিত হয়েছে আব্দুস সুবহান তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইসলামকে অপব্যাখ্যা করে নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করা হয়েছে।”
অন্যদিকে সুবহানের আইনজীবী শিশির মুনির আপিল করার কথা জানিয়ে বলেন, “মামলায় প্রসিকিউশনের দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণকে আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে আমরা মনে করি তাতে আইনগত ও তথ্যগত ভুল রয়েছে।”
জামায়াত নেতা সুবহানের সর্বোচ্চ সাজার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এতে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের ঋণের ক্ষুদ্রতম অংশ হলেও পরিশোধ হবে।
অন্যদিকে রায়ে সন্তুষ্ট হলেও এ পর্যন্ত ঘোষিত সব রায় কার্যকর না হওয়ায় সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ-ের দাবিতে দুই বছর আগে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে যাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।

কে এই সুবহান : পাবনা সদরের সাবেক সংসদ সদস্য সুবহানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সুজানগর থানার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকু-ি গ্রামে। তার বাবার নাম শেখ নাঈমুদ্দিন, মায়ের নাম নূরানী বেগম।

১৯৫৪ সালে সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করা সুবহান পাবনা আলিয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা এবং আরিফপুরের উলট সিনিয়র মাদ্রাসার সুপারিন্টেডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

পাবনা জেলা জামায়াতের কমিটি গঠনের সময় সুবহানকে আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তিনি নিখিল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হন।

১৯৬২ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন সুবহান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমজাদ হোসেনের কাছে তিনি পরাজিত হন।

বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম দমনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে শান্তি কমিটি গঠন করা হলে পাবনা জেলা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পান সুবহান। পরে তিনি ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন।

তার নেতৃত্বেই পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়। এসব বাহিনীর সদস্য ও পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে নিয়ে পাবনার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সুবহান হত্যা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতনের মতো অপরাধ ঘটান বলে এ মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে আসে।

মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশনের ষষ্ঠ সাক্ষী কোরবান আলী কাঠগড়ায় সুবহানকে দেখিয়ে বলেন, তিনি নিজে পিস্তল হাতে গ্রামবাসীদের ধরে এনে গুলি করেন এবং পাক সেনাদের গুলি করতে বলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের নামের তালিকা করে সুবহান পাকিস্তানি সেনাদের কাছে সরবরাহ করতেন বলেও শুনানিতে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ইয়াহিয়া সরকারের পতন দেখে জামায়াতগুরু গোলাম আযমের সঙ্গে সুবহানও পাকিস্তানে চলে যান। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফেরেন এবং পরে সংসদ সদস্য হন।
মামলার দিনপঞ্জি : ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল সুবহানের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেন প্রসিকিউশনের তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইন। পরের বছর ১৫ সেপ্টেম্বর জামায়াতের এই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় প্রসিকিউশনের তদন্ত দল।
এরই মধ্যে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা থেকে সুবহানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
আট ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে নয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর সুবহানের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-১। কিন্তু সাক্ষ্য শুরুর আগেই গতবছর ২৭ মার্চ মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে স্থানান্তর করা হয় ট্রাইব্যুনাল-২ এ।
প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতানা চমনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল শুরু হয় মামলার শুনানি।
প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও মো. নূর হোসাইনসহ ৩১ জন।
অন্যদিকে সুবহানের পক্ষে তিনজনের নাম দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তার আইনজীবীরা কোনো সাফাই সাক্ষী হাজির করতে পারেননি।

দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গতবছর ৪ ডিসেম্বর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন বিচারক।

শেয়ার