মাইশা’র মায়ের কান্নায় কাঁদলো সবাই ॥ চোখ বন্ধ করলেই দেখি স্বামী-সন্তান জ্বলছে!

maisa
সমাজের কথা ডেস্ক॥
ঢাকা: ‘আমি রাজনীতি বুঝি না। আমার স্বামী-সন্তানও রাজনীতি করতো না। তাহলে কেন আমি স্বামী-সন্তানহারা হলাম? কেন মা-বাবার বুক খালি হচ্ছে? এর দায় কে নেবে? প্রধানমন্ত্রীকে এর বিচার করতে হবে। কঠোরভাবে দমন করতে হবে দুর্বৃত্ত বোমাবাজদের। আর একটি মানুষকেও যেন পুড়ে মরতে না হয়’।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) চলমান হরতাল-অবরোধে বিএনপি-জামায়াতের নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা ও সহিংসতা নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শনীতে এসে কথাগুলো বলছিলেন মাফরুহা বেগম মিতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ জাতীয় জাদুঘরে তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাত তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রোল বোমার আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মাইশা নাইমা তাসনিনের মা এই মাফরুহা বেগম মিতা। সে রাতে তিনি প্রিয় স্বামী নুরুজ্জামান পপলুসহ সাত জনকে পুড়ে মরতে দেখেছেন চোখের সামনে। পরে আরও চারজন দগ্ধ মানুষ মারা যান হাসপাতালে, আহত হয়েছেন ৩০ জন।
মিতা নিজেও দগ্ধ হয়েছিলেন। শরীরে এখনো তার দগদগে ক্ষত। মেরুদন্ডে আঘাত পাওয়ায় দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারেন না মাফরুহা বেগম। একমাত্র ছেলে আসিফ ইমতিয়াজ জামান মাথিনসহ পরিবারের অন্যান্যদের সহযোগিতায় হুইল চেয়ারে বসেই গ্যালারির সবক’টি ছবি দেখেন।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কক্সবাজারে আনন্দভ্রমণ শেষে ঢাকা ফেরার পথে কিশোরী মাইশা গভীর রাতে আক্রান্ত হয় আরও কিছু মানুষের সঙ্গে। পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে সে ঘটনায় প্রাণ হারান ১১ জন, আহত হন ৩০ জন। নিহত মাইশা যশোর পুলিশ লাইনস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী ও তার বাবা নুরুজ্জামান পপলু ঠিকাদার ছিলেন। তারা যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা।
সে রাতের বীভৎস, মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া মাফরুহা বেগম মিতা বলেন, ‘মাইশা ডাক্তার হতে চেয়েছিল। ওর বাবার (মো. নুরুজ্জামান পপলু) ইচ্ছে ছিল, এ বছর হজে যাবেন। আমাদের সব স্বপ্ন, ইচ্ছা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে’।
হুইল চেয়ারে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকেন মাফরুহা। গ্যালারির ভেতরে প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীরাও জড়ো হয়ে শুনছিলেন নৃশংস ঘটনার বর্ণনা। অনেক দর্শনার্থী, সাংবাদিককে এ সময় চোখ মুছতে দেখা গেছে।

কান্না কিছুটা থামিয়ে মাফরুহা আবার বলতে শুরু করেন, ‘আর কাউকে যেন চোখের সামনে স্বামী-সন্তানকে পুড়ে মরতে দেখতে না হয়। আমি চোখ বন্ধ করতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই দেখি স্বামী-সন্তান জ্বলছে!!!!’ এবার বিলাপ করে কেঁদে ওঠেন মাইশার মা মাফরুহা মিতা।
হুইল চেয়ার ধরে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে আসিফ ইমতিয়াজ জামান মাথিন মাকে বারবার সান্তনা দিচ্ছিলেন। তবে প্রিয় বাবা-বোনের জন্য মায়ের সঙ্গে সাথে মাথিনও কাঁদছিলেন অঝোরে।
মাথিন এবং তার মা মাফরুহা বেগম মিতার সঙ্গে এসেছেন মাথিনের বড় চাচা আসাদুজ্জামান, জাহাঙ্গীর আলম ফজলু, কাকা আনিসুজ্জামানসহ একান্নবর্তী এই পরিবারের আরো অনেকে। এ চিত্র প্রদর্শনী উপলক্ষে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) যশোর থেকে এসেছেন সবাই।
নিহত মাইশার বড় ভাই আসিফ ইমতিয়াজ জামান মাথিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘পুড়ে যাওয়ার পর আমি আমার বোনটাকে চিনতে পারিনি। আমি বড় হলেও মাইশা আমাকে শাসন করতো। আমার ভালো-মন্দ সব ও খেয়াল রাখতো। আমার বোনটাকে ওরা কেড়ে নিল!’ বলতে বলতে ডুকরে কাঁদতে থাকেন মাথিন।
মাথিন জানান, এই অনুষ্ঠানে এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তার মা মাফরুহা বেগম মিতা এসব সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করার জন্য বলেছেন। দেশবাসীকে সোচ্চার হতে বলেছেন।

মাথিন আরো জানান, যশোরে মাইশার নামে একটি শিশু হাসপাতাল করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন তার মা। পাশাপাশি পেট্রোল বোমায় নিহত সবাইকে ‘গণতন্ত্র রক্ষার শহীদ’ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে।

বড় চাচা মো. আসাদুজ্জামান বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর পেনশনের পুরো টাকা তিনি ‘মাইশা শিশু হাসপাতাল’ গড়ার কাজে ব্যয় করবেন। সমাজের সকল স্তরের ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।

গত বছরের ৫ জানুযারি জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় দুশ’ ছবি নিয়ে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে ১০৬ টি ছোটো-বড় ফ্রেমে এসব ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনী চলবে ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

প্রদর্শনীতে পেট্রোল বোমায় নিহত, আহত, দগ্ধদের ছবিই স্থান পেয়েছে বেশি। এছাড়া বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ, হরতালে দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের ছবিও ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে প্রদর্শনীতে।

গ্যালারিতে প্রদর্শিত ছবিগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দগ্ধ মানুষের ছবি যেকোনো মানুষকে যন্ত্রণা দেবে। প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীরাও থমকে দাঁড়াচ্ছেন এক একটি ফ্রেমের সামনে। পীড়াদায়ক এসব ছবি দেখে হা-হুতাশও করতে দেখা গেছে অনেক দর্শনার্থীকে। কেউ কেউ ঘৃণা প্রকাশ করেছেন তীব্রভাবে। কোনো কোনো দর্শনার্থী দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলমান এ রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসান চেয়েছেন।

প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থী ফরিদা ইয়াসমিনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গ্যালারির দিকে ইঙ্গিত করে বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘এই কি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ? স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে এসেও মানুষকে পুড়ে মরতে হচ্ছে! আমরা আর পুড়ে মরতে চাই না। দগ্ধ হতে চাই না। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।

শেয়ার