প্রেমে যিনি হয়েছিলেন ব্যাংক ডাকাত

prem

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ভালাবাসার মানুষের ইচ্ছাপূরণের জন্য এক সমকামী ব্যক্তি একবার নিউ ইয়র্কে ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন। তবে সঙ্গী ও অস্ত্রশস্ত্রসহ ব্যাংকে প্রবেশ করলেও সফল হতে পারেননি তিনি।
১৯৭২ সালের অগাস্টে ঘটা সেই ঘটনা নিয়ে ‘ডগ ডে অফটারনুন’ নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে।
বিবিসি বলছে, বেশ কয়েকটি প্রামাণ্য চিত্রের অনুপ্রেরণাও যুগিয়েছিল ওই ডাকাতি প্রচেষ্টার ঘটনা।
ঘটনাটি ছিল এ রকম। সমকামী জন ভোজতোভিজ ভালোবাসেন তার পুরুষসঙ্গী আর্নেস্ট অ্যারনকে। এক বছর আগে ঘটা করে তারা বিয়েও করেন। কিন্তু বিয়ের পর অ্যারন নারীর দেহকাঠামো পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।

নিজের এই মনোবাসনা পূরণ না হওয়ায় বিমর্ষ অ্যারন আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। তাতে সফল না হলেও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অসুস্থ অ্যারনের ইচ্ছা পূরণ করার সিদ্ধান্ত নেন ভোজতোভিজ। লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় টাকা তিনি ব্যাংক ডাকাতি করে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করেন।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। ১৯৭২ সালের ২২ অগাস্ট, ভোজতোভিজ ও অপর দুই সঙ্গী স্যালভাতর নাটুরালে ও ববি ওয়েস্টেনবার্গ, শটগান হাতে চেস ম্যানহাটন ব্যাংকের ব্রুকলিন শাখায় হানা দেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

ওয়েস্টেনবার্গ ডাকাতি ছেড়ে ব্যাংক থেকে বের হয়ে যান। তার অপর দুইসঙ্গী ব্যাংক কর্মীদের জিম্মি করে টাকা লুট করতে শুরু করেন। কিন্তু ব্যাংকের সেইফ অর্ধেক খালি হয়েছে মাত্র, এমন সময় ব্যাংকের এককর্মী অ্যালার্ম বাজিয়ে দেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ পুরো ব্যাংক ভবনটি ঘিরে ফেলে। ভোজতোভিজরা ব্যাংকের আটকর্মীকে জিম্মি করে ভিতরে অবস্থান নেন। ব্যাংকের বিপরীত দিকের একটি বিউটি পার্লারে অবস্থান নিয়ে পুলিশ তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।

আশপাশে প্রায় দুই হাজার উত্তেজিত জনতা ঘটনা দেখার জন্য জড়ো হয়। গরমের ওই রাত্রিতে তাদের সঙ্গে এফবিআই এর লোকজন, জরুরি বিভাগের লোকজন ছাড়াও আশাপাশের বাড়ির ছাদগুলোতে স্নাইপার ও টিভি ক্রু’রাও ছিলেন।

পরবর্তী ১৪ ঘন্টা ধরে এ নাটক চলার সময় ভোজতোভিজ দারুণ সব কাজ করেছেন। জিম্মিদের জন্য খাবার দাবি করেছেন। যে লোকটি পিজা দিয়ে গেছেন তাকে প্রচুর টাকা বখশিশ দিয়েছেন ভোজতোভিজ। ঘটনা দেখার জন্য যারা জমায়েত হয়েছিল তাদের উদ্দেশে ক্যাশ ছুঁড়ে দিয়েছেন।

দৈনিকে কাজ করা সাংবাদিক ক্যাপাসতাত্তার বলেছেন, “যে কেউ তাকে ভালবাসবে, তিনি বরিন হুডে পরিণত হয়েছিলেন।”

ক্যাপাসতাত্তার ও অন্য সাংবাদিকরা ব্যাংকে ফোন করে ভোজতোভিজের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। এসব কথাবার্তা আবার টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

পুলিশের সঙ্গে দুই ঘন্টা আলোচনার পর ভোজতোভিজ জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে নিজের শর্তগুলো তুলে ধরেন। নিজ ‘স্ত্রী’ অ্যারনকে কিংস কান্ট্রি হাসপাতাল থেকে এনে দিতে বলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলে এসে ভোজতোভিজের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকার করেন অ্যারন।

ব্যাংকের ভিতরে জিম্মিরা গরমে ক্লান্ত ও ভীত হয়ে পড়লেও ভোজতোভিজকে ভয় পাচ্ছিলেন না। তারা বুঝতে পারছিলেন রোমান্টিক এই ব্যক্তিটি ডাকাত হলেও তাকে ভয়ের কিছু নেই। বন্ধুর মতো আচরণ করা এই ব্যক্তিটি একটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে ডাকাতি করতে নেমেছেন।

১৪ ঘন্টা পর ডাকাতরা বিদেশে চলে যেতে রাজি হলে জিম্মি নাটকের অবসান হয়। এফবিআই’র এক এজেন্ট গাড়ি চালিয়ে তাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যান। কিন্তু জেএফকে বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গেই নাটুরালেকে গুলি করে মেরে ফেলে পুলিশ, আর ভোজতোভিজকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিচারে ভোজতোভিজের ২০ বছরের সাজা হলেও ১৯৭৮ সালেই মুক্তি পান তিনি। তবে তার আগেই তার ঘটনা নিয়ে অনেকগুলো প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

এসব প্রামাণ্য চিত্র থেকে পাওয়া টাকা অ্যারনকে অস্ত্রোপচারের জন্য দিয়ে দেন তিনি। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিজ এডেন নামক নারী হয়ে ওঠেন অ্যারন।

পরে ২০০৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ভোজতোভিজ।

১৯৭২ সালে নিজেকে সমকামী ঘোষণা করে আলোড়ন তুলেছিলেন তিনি। তার ব্যাংক ডাকাতি ও জিম্মি নাটক সমকামীদের সামাজিক সমস্যাটিকে সেই সময় রাষ্ট্রের চোখের সামনে তুলে ধরেছিল।

শেয়ার