পরিপাটি সাজানো পড়ার টেবিল, স্কুলব্যাগ; শুধু নেই মাইশা

teble
প্রতীক চৌধুরী ॥
বাবা নুরুজ্জামান পপলু ও বোন মাইশা নাহিয়ানকে দাফন শেষে আর্তনাদ করে কাঁদছেন আসিফ ইমতিয়াজ মাথিন। তিনি বিলাপ করছেন, ‘আমার বোনটা মায়ের সঙ্গে ঘুমাতো। আজ তাকে বাবার কোলে শুইয়ে দিয়ে আসলাম। আর কোনদিন মায়ের কোলে ঘুমাবে না। আমি ওকে চিনতে পারিনি। আমার ফুলের মত বোন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
মঙ্গলবার ভোর রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় নিহত ৭ জনের মধ্যে ছিলেন যশোরের ঠিকাদার ও জেলা জাসদের সদস্য নুরুজ্জামান পপলু ও তার মেয়ে মাইশা নাহিয়ান।
বুধবার দুপুরে শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডে নুরুজ্জামান পপলু’র বাসায় গিয়ে দেখা গেছে কবরের নিস্তব্ধতা। আবার থেকে থেকে ডুকরে কান্নার শব্দ আর আহাজারি। এই কান্না আর আহাজারির শেষ কোথায় তার উত্তর কারো কাছে নেই। বাড়িতে খালি পড়ে আছে মাইশার পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর পরিপাটি সাজানো দশম শ্রেণির বইগুলো। চেয়ারে ঝুলানো রয়েছে স্কুল ব্যাগ। কিন্তু মাইশা আর এই টেবিল চেয়ার ব্যবহার করবে না। স্কুল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ছুটবে না স্কুলে।
মাকে বলবে না ‘মা তুমি বেশি কাজ করবে না। তোমাকে অনেক দিন বাঁচতে হবে। ছোট্ট মেয়ে অনেক কিছু বুঝতো। বড় মানুষের মত আমাদের জ্ঞান দিত। স্কুল থেকে ফিরে দাদা দাদির সঙ্গে আগে দেখা করতো খোঁজ খবর নিত। আর কোন দিন মাইশা খোঁজ খবর নিবে না দাদা দাদি, মা, ভাই কেমন আছে।’ এভাবেই বিলাপ করছিলেন মাইশার মা মাহফুজা বেগম মিতা। শোকে কাতর শয্যাশায়ী মিতা স্বামী সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। স্বামী নুরুজ্জামান পপলু ও মেয়ে মাইশা নাহিয়ানকে চোখের সামনে জীবন্ত পুড়ে মরতে দেখেছেন তিনি।
মাইশার শোবার ঘরে শয্যাশায়ী মা মিতা বিলাপ করতে করতে জানান, ‘রাত দুটো পর্যন্ত আমার মেয়ে আমার কোলের মধ্যে ঘুমিয়েছিল। আগুন ধরে গেলে ওর বাবা বলে, তুমি আগে বেরিয়ে যাও। আমি মাইশাকে নিয়ে আসছি। ওরা আর আসতে পারলো না। আমার ছোট্ট মেয়েটি ওর বাবার কোলের মধ্যে পুড়ে মরেছে। গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে আমি মুখে চাদর চেপে ধরি। তাই আমার কিছু হয়নি। ওদের গায়ে ছোয়েটার ছিল। ওদের মুখের মধ্যে গ্যাস চলে গেছে বলে ওরা বাঁচতে পারেনি।’
মাইশার ভাই আসিফ ইমতিয়াজ মাথিন আহাজারি করছিলেন, মাইশাকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। কক্সবাজারে গিয়ে কত সুন্দর সুন্দর ছবি তুলেছে। আর কোন দিন ওকে আর পাব না। আমার বাবাকে কত লোক ভালোবাসে। তাকে কত লোক দেখতে এসেছে। কিন্তু আমার বাবা আর বোন কোনদিন ফিরবে না।’
চার সদস্যের পরিবারের দু’জনকে হারানো মাহফুজা বেগম মিতা ও আসিফ ইমতিয়াজ মাথিনকে সান্ত¡না দেয়ার ভাষা কারো জানা নেই। তাদের ঘিরে চারপাশে স্বজন, প্রতিবেশিরা অঝরে কাঁদছেন। মাইশার দাদা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ছেলে ও নাতনির শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

শেয়ার