অবুঝ শিশুরা নির্বাক হয়ে শুধুই কাঁদছে ॥ কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্রে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ঠিকানা হয়েছে ৫ মায়ের

ma
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ স্কুল পড়–য়া শিশু দুর্জয় (১২) তার দুই বছরের ছোট ভাই সুজয়কে কোলে নিয়ে পথে পথে ঘুরছে। তবুও ভাইয়ের কান্না থামছে না। শিশু বোনের কান্না থামাতে সে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বলছে মা আসছে …. মা আসছে।
শুধু শিশু দুর্জয় নয় কোতোয়ালি থানা পুলিশের রোষানলে পড়ে তার মতো আরও ৭/৮টি শিশু পড়াশুনা, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। স্থানীয়রা জানায়, শহরের পুলিশ লাইন টালিখোলা এলাকার সমীর রায় যশোর শহরের একটি হোটেলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ায় সমীর সবসময় ঝামেলা এড়িয়ে চলে। সারাদিন কাজ করে যে টাকা আয় হয় তা নিয়েই অন্ধ মা শেফালী, স্ত্রী কনিকা রানী রায়, ১৩ বছর বয়সী স্কুল পড়–য়া ছেলে দুর্জয় ও দুবছর বয়সী ছোট ছেলে সুজয়কে নিয়ে সুখে-শান্তিতেই দিন কাটাচ্ছিলেন। বড় ছেলে পুরাতন কসবা ঘোষ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় এলাকাবাসী যুবলীগ নেতা সরোয়ার আলম টুলু হত্যা মামলার প্রধান আসামি ময়নুদ্দিন মিঠু ওরফে নোয়াখাইল্যা মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করলে তার মা কনিকা ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ এলাকাবাসীর উপর আতর্কিত হামলা শুরু করলে নারীরা ঘটনাস্থলে আটকা পড়ে। পরবর্তীতে পুলিশ কণিকা রানী, ঝর্না বেগম, মিজানুর রহমানের স্ত্রী ঝর্না বেগম, টালিখোলা মাদ্রাসাপাড়ার নজরুল ইসলামের স্ত্রী কহিনুর বেগম, মৃত রহমান ফরাজীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকে আটক করে অস্ত্র ও মারামারির নাটক সাজিয়ে জেল হাজতে পাঠায়। একটি কুচক্রি মহলের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ তাদের আটক করলেও এসব দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা কেউ মনে করেনি।
মিথ্যা মামলায় জেলখানায় থাকা কনিকা রানীর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার অন্ধ শাশুড়ি শেফালী রায়ের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাবা আমি অন্ধ মানুষ। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই ছেলে আমাকে খেতে-পরতে দেয়। কিন্তু আমার বৌমাকে বিনা অপরাধে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সেই বৃহস্পতিবার থেকে ছোট নাতিটি (এক বছর বয়সী শিশু সুজয়) কাঁদতে কাঁদতে অসাড় হয়ে যাচ্ছে। আজ দু’ দিন কান্নার কারণে বাচ্চাটির প্রচন্ড জ্বর হয়েছে। সেই থেকে বড় নাতি (দুর্জয়) পড়াশুনা বন্ধ করে ওকে কোলে নিয়ে ঘুরছে। ছেলে কাজ বন্ধ করে পথে পথে ঘুরছে। কিন্তু আমি পুরোপুরি অন্ধ হওয়ায় কোন কাজ যেমন করতে পারছি না, ওদের কষ্টও সইতে পারছি না। বলো বাবা আমি এখন কি করব।’ তিনি আরও জানান, তাদের সংসারে সেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে উঁনুন জ্বলেনি। প্রতিবেশীরা যে-যা দিচ্ছেন তাই খেয়ে থাকছি। শুধুমাত্র এই পরিবারটি নয়, একই এলাকার আব্দুল মতিনের পরিবারেও একই অবস্থা। তার স্ত্রীও মিথ্যা মামলায় কারাগারে। মতিনের ১২ বছর বয়সী স্কুল পড়–য়া ছেলে ঈশান (১২) তার ছোট বোন আদরীকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আদরি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শিশু ঈশান জানায়, সে আরবপুর এলাকার এফর্ট স্কুল এন্ড কলেজে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু তার মাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ায় খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে তারা। অপরদিকে, একই ঘটনায় স্থানীয় নজরুল ইসলামের স্ত্রী কহিনুর বেগমকে পুলিশ আটক করায় তার তিন বছরের শিশু বৃষ্টির কান্না থামছে না। শিশু বৃষ্টিকে তার চাচীরা কোলে তুলে আদর-যতেœ রাখলেও মা ছাড়া অবুঝ শিশুর কান্না থামানো যাচ্ছে না। এছাড়াও আজিবর হাওলাদারের স্ত্রী জোহরা বেগমকে একই ঘটনায় পুলিশ আটক করায় বড় অসহায় হয়ে পড়েছে তার অসুস্থ মেয়ে রাবেয়া খাতুন। জানা গেছে, আজিবর হাওলাদারের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে রাবেয়া বড়। ছোট ছেলে ইমরান (১২) অভাবের তাড়নায় একটি মটর গ্যারেজে কাজ করে। কিন্তু তাদের মাকে পুলিশ গ্রেফতার করা ও বোন রাবেয়া খুবই অসুস্থ হওয়ায় তাদের বাড়িতে রান্নার পর্যন্ত লোক নেই। বর্তমানে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তাদের খাওয়া হচ্ছে। আরেক মহিলা আনোয়ারা বেগম। স্বামীহারা এই নারীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে বিয়ে করে যে যার মতো সংসার করছে। তবে ছেলে মেয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশি ভালো নেই। ফলে তাদের মা আনোয়ারা বেগম কারও বোঝা না হয়ে নিজে আয় করে সংসার চালাতেন। কিন্তু পুলিশের রোষানলে অন্য ৪ নারীর মতো তারও ঠিকানা হয়েছে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। তিনটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর জীবন বিপন্ন করে তাদের মাকে আটক করার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সকল শিশুদের মায়েরা কুখ্যাত সন্ত্রাসী নোয়াখাইল্যা মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করায় কুচক্রি মহল মিঠুকে খুশি রাখতে পুলিশের মাধ্যমে অসহায় গরিব নারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। আর মানবেতন জীবন যাপন করছে তাদের পরিবার।

শেয়ার