টুলু হত্যার বিচার দাবি করায় পুলিশের রোষানলে এলাকাবাসী ॥ ‘ঘাতক নোয়াখাইল্যা মিঠু’র বাড়ি ঘেরাও করায় পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ, গুলিবর্ষণ

tolo hotta
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যুবলীগ নেতা সরোয়ার আলম টুলু হত্যা মামলার প্রধান আসামি ময়নুদ্দিন মিঠু ওরফে নোয়াখাইল্যা মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশের রোষানলে পড়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। মধ্যরাতে নিরীহ নারী পুরুষের ওপরে হামলে পড়ে গুলিবর্ষণ ও অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে তারা। আর এরপর কথিত বোমা ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ মামলায় স্থানীয় ৫ নারীসহ ৭ জনকে আটক করে চালানও দেয়া হয়েছে। অথচ নোয়াখাইল্যা মিঠুর বিরুদ্ধে আরও দু’টি হত্যা প্রচেষ্টা ও বিস্ফোরক মামলা থাকলেও পুলিশ তাকে আটক করেনি। আর ৫ নারীকে আটক করে বোমা-দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার ও মারামারির পৃথক দুটি মামলায় আটক দেখানোর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আটককৃতরা হলেন, শহরের পুলিশ লাইন টালিখোলা এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী ঝর্না বেগম, সমীর রায়ের স্ত্রী কনিকা রানী রায়, আজগর হাওলাদারের স্ত্রী জোহরা বেগম, আব্দুল কাদেরের ছেলে মাহাবুর আলম, মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে নূর ইসলাম, টালিখোলা মাদ্রাসাপাড়ার নজরুল ইসলামের স্ত্রী কহিনুর বেগম, মৃত রহমান ফরাজীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। এছাড়াও পলাতক দেখিয়ে পুরাতন কসবা টালিখোলা এলাকার আকাবার মিয়ার ছেলে উজ্জল, মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে শান্টু, শামছুদ্দিনের ছেলে রাজ্জাক, ইমান আলীর ছেলে সোহাগ, মৃত নূর ইসলামের ছেলে শামীম ও শাহীন, আব্দুস সাত্তারের ছেলে ফটিক, কাদের কসাইয়ের ছেলে মকা, আমিন কন্ট্রাক্টরের ছেলে জামাল, আব্দুল জব্বারের ছেলে মারুফ, একই এলাকার নাছির, খড়কি এলাকার মফিজুর রহমানের ছেলে রিচি, বাবলু রহমানের ছেলে নয়ন, মিরাজের ছেলে হাফেজ, কোনার ছেলে হেলাল ও আব্দুল মান্নানের ছেলে সাগরকে আসামি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যুবলীগ নেতা টুলু হত্যা মামলার প্রধান আসামি নোয়াখাইল্যা মিঠু আদালত থেকে জামিন পেয়ে বুক ফুলিয়ে এলাকায় ফিরেছে এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ লাইন টালিখোলা ও পুরাতন কসবা এলাকার কয়েকশত নারী-পুরুষ নোয়াখাইল্যা মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করে। আর এতে ঘাবড়ে গিয়ে সন্ত্রাসী মিঠু তার শুভাকাক্সিক্ষ ও পুলিশকে খবর দেয়। এসময় নোয়াখাইল্যা মিঠুর লোকজন এলাকাবাসীর ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটনায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে এলাকাবাসীর ওপর লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। সাথে যোগ দেয় মিঠুর সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরাও। এতে উজ্জ্বল নামের একজন পুলিশের গুলিতে আহতসহ অন্তত ২৫/৩০জন নারীপুরুষ আহত হন।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, পুরাতন কসবা টালিখোলার দারুল উলুম খাদেমুল ফাজিল মাদ্রাসা ঘোপ এলাকার মৃত হেদায়েতুল ইসলামের ছেলে ময়নুদ্দিন মিঠু ওরফে নোয়াখাইল্যা মিঠু একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার আপন ভাইসহ বেশ কিছু সন্ত্রাসী নিয়ে সে এলাকায় একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছে। ওই বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় এলাকায় জমি দখল, জমি ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে বেড়ায়। তাদের অপকর্মে সাড়া না দেয়ায় এবং মিঠুর ভাই শিপন পঞ্চম শ্রেনির এক স্কুল ছাত্রীকে জোর করে বিয়ে করার প্রতিবাদ করে যুবলীগ নেতা সরোয়ার আলম টুলু। এতে টুলুর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে শিপন ও তার ভাই মিঠুসহ সন্ত্রাসী বাহিনী। এক পর্যায়ে গত ২৯ এপ্রিল ভোরে মায়ের সামনে টুলুকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে মিঠু বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় টুলুর ভাই খায়রুল আলম হিরু বাদী হয়ে সন্ত্রাসী মিঠুসহ তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। টুলু হত্যা মামলা ছাড়াও মিঠু এবং তার ভাইদের বিরুদ্ধে আরো ৩টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে এলাকার ফিরোজ ও আলমগীরকে হত্যা প্রচেষ্টা মামলা এবং তার বাড়িতে বোমা হামলাসহ ৪টি মামলা রয়েছে। সরোয়ার আলম টুলু হত্যার পরে মিঠু প্রায় এক বছর এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। গত ২৯ জুন আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিনের আবেদন করে। কিন্তু বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেন। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের রিমান্ডে নেয়। ১৯ দিন হাজতবাসের পর গত বৃহস্পতিবার জামিন পেয়েছেন মিঠু ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ১১ সদস্য। ওই রাতে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হওয়ার পর অদৃশ্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তদবিরে পুলিশ প্রহরায় তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। কিন্তু টুলু হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে বাড়িতে আসলে আবার নতুন করে কার মায়ের কোল খালি হবে এ আতঙ্কে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়ি ঘেরাও করে। এসময় নোয়াখাইল্যা মিঠুর পোষা সন্ত্রাসীরা এলাকাবাসীর ওপর দেশীয় অস্ত্র, বোমা নিয়ে হামলা চালায়। আর পুলিশও ওই সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে এলাকাবাসীর উপর লাঠিপেটা শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশ এলাকাবাসীকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলিও চালায়। ওই গুলিতে উজ্জল হোসেন এবং লাঠিপেটায় অন্তত ২৫-৩০জন নারী-পুরুষ আহত হয়েছেন। এছাড়াও পুলিশ এবং ওই সন্ত্রাসীদের লাঠিপেটা থেকে রক্ষা পাননি দৈনিক সমাজের কথার ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম শুভ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ক্যামেরা পারসন সাব্বির হোসেন। কিন্তু বিশেষ একটি মহলের নির্দেশে ও কোতোয়ালি থানার ওসির যোগসাজসে পুলিশ নাটক সাজিয়ে ধারালো অস্ত্র ও বোমা দিয়ে আটক এলাকার নারী-পুরুষদের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা করেছে ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৪টি মামলার আসামি নোয়াখাইল্যা মিঠু বৃহস্পতিবার সরোয়ার আলম টুলু হত্যা মামলায় জামিন পান। কিন্তু টুল হত্যা মামলা ছাড়াও মিঠুর বিরুদ্ধে ফিরোজ হত্যা প্রচেষ্টা মামলা, আলমগীর হত্যা প্রচেষ্টা ও তার বাড়িতে বোমা হামলার মামলা রয়েছে। এ সব মামলায় তিনি জামিন নেননি। অথচ পুলিশ ওইসব মামলার ফেরারি আসামিকে আটক না করে তার পক্ষ নিয়ে তান্ডব চালিয়েছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে হত্যা মামলার আসামি নোয়াখাইল্যা মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করে কর্মসূচি পালন করা হয়। মিঠুর লোকজন ও পুলিশ একত্রিত হয়ে এলাকাবাসীর ওপর হামলা চালিয়েছে। আবার এলাকাবাসীদের আটক করে অস্ত্র বিস্ফোরক মামলায় সোপর্দ করা হয়েছে। এদিকে, সন্ত্রাসী মিঠু এলাকায় আবারো কার মায়ের কোল খালি করবে এমন আশঙ্কা অনেকের। এ প্রসঙ্গে যশোর কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম বলেন, ক্রিমিনালরা তো বলবেই মিথ্যা মামলায় অস্ত্র দিয়ে আটক দেখানো হয়েছে। পুলিশের গুলিবর্ষণের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। আর মিঠুর বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা থাকলেও তাকে কেন আটক করা হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বললেন, ওই মামলার ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই।
এ ব্যাপারে যশোর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) রেশমা শারমিন জানিয়েছেন, আটককৃতরাসহ আরো কিছু লোকজন এলাকার যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুদ্দিন মিঠুর বাড়ি ঘেরাও করে ভাংচুর চালানোর সময় পুলিশ তাদের আটক করে।

শেয়ার