পাইকগাছায় জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ৩টি গ্রাম প্লাবিত : আতঙ্কে মানুষ ॥ বিপদসীমার দু’ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে শিবসা নদীর পানি

beri badh
এসএম লোকমান হেকিম (খুলনা) কপিলমুনি॥ পূর্ণিমার প্রবল জোয়ারের পানিতে আইলা বিধ্বস্থ উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছার লতা ইউনিয়নের পুতলাখালি এলাকার পাউবোর বেড়ী বাঁধ ভেঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে সেখানকার গাজীরচক, বাবোনের আবাদ, ধলাইসহ ৩/৪টি গ্রামের অসংখ্য মৎস্য ঘের ও বাড়ি ঘর তলিয়ে গেছে। এছাড়া শিবসা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধের দু’ফুট বিপাদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্থানীয়রা পুতলাখালির বাঁধটি মেরামতের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২৫০ কিলোমিটার বেড়ী বাঁধের ১০৭ কিলোমিটার’ই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোন কোন এলাকার অবস্থা এতই নাজুক যে, দ্রুত সংস্কার না হলে চলতি বর্ষা মওসুমের যে কোন সময় অতিরিক্ত পানির চাপে বাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল ও মৎস্য খামার ভেসে যেতে পারে। হুমকির মুখে পড়তে পারে অসংখ্য বসতবাড়ি। তবে পাউবো বলছে সময় স্বল্পতা ও আর্থিক সংকটের কারণে মওসুমের আগে সব বাঁধ মেরামত সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে চরম আতংকের মধ্যে রয়েছে সেখানকার হাজার হাজার পরিবার।
পাউবো সুত্র ও এলাকাবাসী জানায়, খুলনার উপকূলীয় অঞ্চল পাইকগাছায় ষাটের দশকে নির্মিত হয় ওয়াপদার বেড়ী বাঁধ। উপজেলার ৯টি পোল্ডারে মোট বাঁধের পরিমাণ ২৫০ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাব, অপরিকল্পিত ভাবে বাঁধ কর্তনে তা দেবে নিচু ও সরু হয়ে গেছে। বাঁধ কেটে বিস্তীর্ণ এলাকায় লোনা পানি অনুপ্রবেশ, পাইপ বা পানির কল স্থাপন ও অব্যাহত প্রাকৃতিক দূর্যোগে বাঁধগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এনিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলে পাউবো ২০১১-১২ অর্থ বছরে প্যাকেজ প্রকল্পের আওতায় ২৪ কোটি ৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয়ে মাত্র ২৩ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত করে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের পরিমা থেকে যায় ১৩০ কিঃমিঃ। সুত্র জানায়, উপজেলার ৯টি পোল্ডারের মধ্যে ৯নং পোল্ডারে বেড়ী বাঁধ রয়েছে ৮.২ কিঃমিঃ যার মধ্যে রাড়–লী ও কাটাখালী এলাকার প্রায় ৩কিঃমিঃ ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও ঐ সময় মাত্র ১.০১ কিঃমিঃ সংস্কারের আওতায় নেয়া হয়। ১০/১২ নং পোল্ডার অভ্যন্তরে মোট বাঁধ রয়েছে ৬৮.৮০ কিঃমিঃ। এর ৪১.৮ কিঃমিঃ পাইকগাছা ও বাকী ২৭ কিঃমিঃ কয়রা সীমানার মধ্যে। পাইকগাছা সীমানার মধ্যে শান্তা, ফকিরাবাদ ও গড়–ইখালী এলাকার প্রায় ১৭ কিঃমিঃ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও ঐ সময় সংস্কারের আওতায় নেয়া হয় মাত্র ২.৮১০ কিঃমিঃ। ১৬নং পোল্ডারের ৪৫.৩০ কিঃমিঃ বাঁধারে মধ্যে কচুবুনিয়া, হিতামপুর, শিলেমানপুর, তালতলা ও ভৈরব ঘাটা এলাকার প্রায় ১৬ কিঃমিঃ দেবে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যার মাত্র ২.২৫০ কিঃমিঃ সংস্কার হয়। ১৮/১৯ নং পোল্ডারে ৩২.২০ কিঃমিঃ বাঁধারে হালদারচক, লতা ও ধলাই এলাকার প্রায় ১২ কিলোমিটার’র মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ৮ কিঃমিঃ যার ৩.৬৫০ কিলোমিটারের সংস্কার হয়েছে। ২০/১ নং পোল্ডারের ৬ কিঃমিঃ বাঁধের মধ্যে ৩ কিঃমিঃ, ২১নং পোল্ডারের ১৯.৪৫ কিলোমিটার’র মধ্যে ৯ কিঃমিঃ, ২২নং পোল্ডারের ১৯.৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৫ কিঃমিঃ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কিন্তু কাজ হয় যৎসামান্য এবং ২৩ নং পোল্ডারের মধ্যে ৩৭ কিঃমিঃ ওয়াপদা বেড়ী বাঁধের ১৩ কিঃমিঃ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যার ৯.২৭০ কিঃমিঃ সংস্কার হয়। সর্বশেষ ১০/১২ নং পোল্ডারের প্রায় ৩ কিঃমিঃ, ১৬ নং পোল্ডারের হিতামপুর, ২২ নং এর আমুরকাঁটা, সোনাখালি স্লুইচগেট এলাকার বাঁধের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শিবসা নদী তীরবর্তী বাঁধের লস্কারের আলমতলা বাজার এলাকায় ভাঙ্গন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে সেখানকার বাঁধের প্রায় এক চতুর্থাংশ গিলে ফেলেছে আগ্রাসী শিবসা। বাঁধটি অতি দ্রুত সংস্কার না হলে যে কোন মূহুর্তে সম্পূর্ণ বাঁধটি ভেঙ্গে ঐ এলাকার ৫/৬টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে বলে আশংকা এলাকাবাসির। প্রসঙ্গত, ঐ পোল্ডারে পাইকগাছা সীমানায় বাঁধের পরিমান ৪১.৮ কিঃমিঃ ইতোপূর্বে ২০১২ সালে সংস্কার পূর্ব ১৭ কিঃমিঃ ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হলেও সংস্কার হয় মাত্র ২.৮১০ কিলোমিটার বাঁধ। মূলত: ঐ সময় থেকেই বাঁধটির আলমতলা এলাকায় ভাঙ্গন বিস্তার লাভ শুরু করে। কিন্তু পাউবো অজ্ঞাত কারণে তখন থেকেই বাঁধ সংস্কারে রয়েছে উদাসীন। বর্তমানে বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে সেখানকার চকবগুড়া ও শ্রীকন্ঠপুর মৌজার প্রায় দু’হাজার বিঘা জমির ফসল,মাছ খামার ও অসংখ্য বসতবাড়ি তলিয়ে যাবে নিমিষেই। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় লস্কর ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আরিফুজ্জামান তুহিন বলেন, বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে আলমতলা, লক্ষীখোলা, কেওড়াতলা, হেতালবুনিয়া ও স্মরনখালীসহ চাঁদখালী ইউনিয়নের একটি বড় অংশ প্লাবিত হবে। তিনি ক্ষোভের সাথে আরো বলেন, বিষয়টি জানার পরও পাউবো শাখা কর্মকর্তা কোন গুরুত্বই দিচ্ছেন না। বরং তিনি উল্টা-পাল্টা কথা বলে সবকিছু তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে পাউবোর ঐ এলাকার এসও শহিদুল্লাহ মজুমদার বলেন, বাঁধ মেরামতের ব্যাপারে এখন আর কোন বরাদ্দ নেই। তাছাড়া সেখানকার জনৈক ঘের ব্যবসায়ীর সহায়তায় ভাঙ্গনকূলের পোল্ডার অভ্যন্তরে রিংবাঁধ দেয়ায় আপতত: বুঁকিমুক্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি। ৩ নং লতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজল কান্তি বিশ্বাস জানান, পুতলাখালির বাঁধ ভেঙ্গে ঐ এলাকার ৩/৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অনেক বাড়ি ঘর তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে বহু মৎস্য খামার। সবমিলিয়ে সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাঁধ মেরামতের জোর প্রচেষ্টা চলছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির উদ্দীনের নিকট জানতে চাইলে তিনি এলাকার বাইরে আছেন বলে জানান। এনিয়ে পাউবো-২ এর নির্বহিী প্রকৌশলী মুজিবর রহমান বলেন, পাউবোর নিজস্ব অর্থায়নে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কিছু বাঁধের সংস্কার চলছে। তবে মৌসুমের আগে সময় স্বল্পতা ও আর্থিক সংকটের কারণে বাঁধ মেরামত সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে বেঁড়ী বাঁধের সংস্কার কাজ শুরু করা হবে। তখন বাঁধ আরো মজবুত ও এর উচ্চতা বৃদ্ধি করা হবে। সবমিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো নিয়ে পাইকগাছার মানুষ আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তারা এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শেয়ার