পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ॥ চুরি ছিনতাই মাদক সেবন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিত্য দিনের চিত্র হলেও খোশ গল্পে মেতে থাকে পুলিশ

jessore sadar hospital
এস হাসমী সাজু ॥
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালের স্টাফসহ প্রায় ২ হাজার মানুষের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে মাত্র ৩জন প্রহরী। পুলিশ থাকলেও তারা দিনভর খোশ গল্পে মেতে থাকে। দীর্ঘ আট বছর ধরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় চুরি ছিনতাই মাদকসেবন কেনাবেচা ও টানাবাজদের অপতৎপরতা চরমে উঠেছে।। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এখানে নিত্যদিনের চিত্র। হাসপাতালে পুলিশ থাকলেও তারাও থাকেন অবৈধ রোজগারের ধান্ধায়। ফলে কোনভাবে হাসপাতাল ক্যাম্পাশকে নিরাপত্তা বেষ্টনির ভেতর আনা যাচ্ছে না। যেকারণে অপুরণীয় সব ক্ষয়-ক্ষতিরমুখে পড়তে হচ্ছে ডাক্তার থেকে শুরু করে রোগী ও তাদের স্বজনদের। একাধিক সুত্রে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের কম্পাউন্ডার ৮ ঘন্টা করে ৩ শিফটে ৩ জন করে মোট ৯ জন প্রহরী দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে আছে মাত্র ৩ জন। তারাও রুটি-রুজির ধান্ধায় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পয়সার কাজ কর্ম নিয়ে লিপ্ত থাকেন। ফলে সম্পূর্ণ হাসপাতাল এলাকা নিরাপত্তাহীন হয়ে আছে। হাসপাতালের বহিঃবিভাগ প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭শ’ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসে। তাছাড়া এ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ ভর্তি রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় দুই হাজার মানুষ হাসপাতালের কমপাউন্ডে আসা-যাওয়া করেন। অথচ তাদের নিরাপত্তার জন্য ৯ জনের পরিবর্তে মাত্র ৩জন প্রহরী দায়িত্ব পালন করে আসছেন দীর্ঘ আট বছর। তারপর দায়িত্বে থাকা ৩জন প্রহরীর মধ্যে কেউ সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন না। অপরদিকে হাসপাতালের মধ্যে পুলিশ থাকলেও তারা খোশ গল্প করে আর দালালদের কাছ থেকে দিন শেষে হিস্যা নিয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। হাসপাতালের এই দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য তত্ত্ববধায়কের কার্যালয়ে অবস্থিত হিসাব রক্ষকের কার্যালয়ে চুরিসহ প্রতিদিন ক্যাম্পাসের ভিতরে মাদকসেবীদের আড্ডা-আসর বসে। তাছাড়া বহিরাগত সন্ত্রাসী, মাদকসেবী ও দালালদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এখানকার চিকিৎসক, সেবিকা স্টাফ ও রোগীরা সর্বদা তটস্থ থাকেন। অভিযোগ আছে এ সমস্ত সন্ত্রাসী ও দালালরা প্রায় সময়ই হাসপাতালের অভ্যন্তরে মারামারিসহ বিভিন্ন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। কেউ প্রতিবাদ করতে আসলে সন্ত্রাসীরা তাকে লাঞ্ছিতসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরে ২৮ মার্চ নিরাপত্তা প্রহরী থাকার পরও হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনে অবস্থিত হিসাবরক্ষক রুহুল আমিনের রুমের তালা ভেঙে দুর্বৃত্তরা চুরি করে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পত্র তছনছ করে। এইভাবে দুর্বৃত্তরা গত ২০১৩ সালের মার্চে ওই রুম ভেঙে ডাকাতি করেছিল। এদের সাথে হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রহরী সিলিও থাকার অভিযোগে ঐ রাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীকে শোকজ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্ব সমাপ্ত করে। এছাড়াও গত ৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসীদের হাতে বেজপাড়া এলাকার ফারুক হোসেন নামে এক দর্শনার্থী কোন কারণ ছাড়াই তাকে প্রহর করে। এর আগে ৭ জুলাই হাসপাতালের মেডিসিন ব্যাংকের কর্মচারী শাওন (২৫) ফার্মেসীতে ওষুধ নিতে গেলে ঘোপ নওয়াপাড়া এলাকার অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে মারপিট করে পালিয়ে যায়। একইদিন রাতে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে ঢুকে কাঁঠাল গাছ থেকে কাঁঠাল পাড়ার সময় নাইট গার্ড প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসীরা তাকে মারপিট করে। এর ৪/৫ দিন আগে হাসপাতালের সার্জারী ওয়ার্ডে খাবার দিতে যেয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হাতে হাসপাতালের দু’কর্মচারী লাঞ্ছিত হয়। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই দুপুরে হাসপাতালের অপারেশন রুমের ভিতর তুচ্ছ ঘটনায় ডাঃ নূর কুতুবুল আলমকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। প্রতিবাদে চিকিৎসকরা ১৫ জুলাই কর্মস্থলে নিরাপত্তা দাবিতে কালো ব্যাচ ধারণ কর্মসূচি পালন করে। এ ধরণের ঘটনা হাসপাতালে প্রায়শই ঘটে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী অভিযোগ করে বলেন, দালাল ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালের কমপাউন্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে অবস্থান করে রোগীর দর্শনার্থী তরুণীদের অশ্লালীন ভাষায় বিরক্ত করে। এছাড়া হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের ওষুধ মোবাইল সেট চুরি করে থাকে। তারা আরও অভিযোগ করেন হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুলিশ থাকলেও তারা বহিরাগত সন্ত্রাসী ও দালালদের সাথে মিলে নগদ নারায়নে তুষ্ট হয়ে তাদের সহযোগিতা করে। তাদের উপস্থিতিতে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনে চুরির ঘটনা ঘটে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক বলেন, হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে ৯ জনের স্থলে প্রতি শিফটে একজন করে তিনজনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন খাতের কর্মচারী হওয়াই তারাও ঠিকমত দায়িত্ব পালন করে না। কিছু বলা হলে তারা উল্টো চাকরি ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এছাড়াও জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন করা হলেও শূন্য পদ পূরণের কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না মন্ত্রণালয়।

শেয়ার