পদ্মা ঘিরে হংকংয়ের আদলে শহরের পরিকল্পনা

Hong Kong City
সমাজের কথা ডেস্ক॥ পদ্মা সেতু নির্মাণের পর নদী তীরে হংকংয়ের আদলে একটি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে সে অনুসারে সামনে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলন কেন্দ্র, বাণিজ্য মেলা, বিনোদন কেন্দ্রসহ ঢাকার নিকটবর্তী ওই এলাকা ঘিরে নগরায়নের বিষয়ে এরইমধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থায়ন নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর নিজস্ব অর্থে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেছে সরকার, যা আগামী চার বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রোববার যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তার পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, “সেখানে আমরা একটা নতুন শহর গড়ে তুলতে পারি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে। সেখানে একটা ভালো কনভেনশন সেন্টার করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্য মেলাটাও যদি ওখানে করতে পারি তাহলে ওই জায়গা উন্নত হয়ে যাবে। ওখানে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য ব্যবস্থা করতে পারি।
“ওই জায়গাটা জিরো পয়েন্ট থেকে কাছে, মাত্র ২৫ কিলোমিটার। কাজেই ওই জায়গাটায় আমরা নতুন একটা আলাদা শহর গড়ে তুলতে পারি। যে শহরটা হংকং বা ওই ধরনের…. মাথায় রেখে গড়ে তুলতে পারি। কাজেই সেভাবে আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
দক্ষিণ চীন সাগর তীরবর্তী শহর হংকং পরিকল্পিত সুসজ্জিত নগরী। চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং পার্ল নদীর তীরে, যার উত্তরে কুতুয়াং প্রদেশ আর তিনদিকে সাগর।
পদ্মা সেতু নির্মাণে ওই এলাকায় জমির দাম বেড়ে চর দখলের হিড়িক পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর পাশেই মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের বাধায় সে পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার।
মুন্সীগঞ্জের ওপারে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুর পাশেই ফরিদপুরের ভাঙায় নতুন বিমানবন্দর করার কথা তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী এদিন পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ভূমিকা ও নানা ধরনের ‘বাধা’ নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, “একবার বাধা এসেছে, বাধা অতিক্রম করেছি। সবসময় মনে রাখতে হবে আর যেন বাধা কেউ না দিতে পারে, সেভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
“পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে আপনারা জানেন, অনেক তোলপাড় হয়ে গেল। সেটা আর কিছুই নয়, এখানে একটা অন্য ধরনের উদ্দেশ্য ছিল। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে একেবারে কোন কারণ ছাড়াই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তার যাওয়ার শেষ দিন- বোর্ডে যেটা অ্যাপ্রুভড হয় নাই, কিন্তু কোন একটা মহল বিশেষ, যেখানে আমাদের দেশের কিছু লোক আছে, অ্যামেরিকার তো আছেই, তাদের প্ররোচনায় এই সেতুতে বরাদ্দটা তারা বাতিল করল।”
সম্ভাব্য দুর্নীতি হওয়া নিয়ে ‘শেষ মুহূর্তে’ বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিল করলে তা ‘চ্যালেঞ্জ’ করা হয় বলে জানান শেখ হাসিনা।
“যখন চ্যালেঞ্জ করলাম, কোন এভিডেন্স দিতে পারেনি। কার ডায়েরিতে নাকি লেখা আছে কে কত পারসেন্ট পাবে।”
পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করাটা ‘এত সহজ ছিল না’ বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “যখনই আমরা বলেছি, নিজস্ব অর্থায়নে করবো, তখন আবার নানা শর্ত নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
“এইভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমরা শুরু করেছি। আপনাদেরকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যে কাজটা শুরু করেছি, কাজটা যেন আমরা করতে পারি দ্রুত।”
এসময় বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে ‘দ্বিমতের’ কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
“১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর অনেকগুলি বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের বেশ দ্বিমত হয়। বিআরটিসি তারা বন্ধ করে দিতে বলেছিল। বিএনপি সরকার এসে বিআরটিসি বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমি এসে বললাম, না এটা হতে পারে না। আমরা বিআরটিসি চালু রাখলাম এবং এখন লাভজনক হয়েছে।
“একইভাবে খুলনা শিপইয়ার্ড, এটাও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন ছিল বন্ধ করে দেয়ার। আমরা বললাম বন্ধ করবো না।”
“সমস্যাটা আমাদের, দেশটা আমাদের, আমরা জানি আমরা কিভাবে করবো। তাদের কয়েকজন লোক আসে, উনারা একটা প্রেসক্রিপশন দেবে আর সেটা আমাদের মানতে হবে এটাও ঠিক না। আমাদের দেশের মানুষের মাথায় বুদ্ধি কম নাই যে তারা চিন্তা করতে পারবে না।”
শেখ হাসিনা বলেন, “বাঙালি পারে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে। বৈদেশিক মুদ্রার আমাদের কোনো অভাব নেই। ২১ বিলিয়ন আমাদের রিজার্ভ, এরমধ্যে এক দুই বিলিয়ন খরচ করা কোনো ব্যাপারই না।”
এদিকে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীনের (বিসিআইএম) মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন ও অর্থনৈতিক করিডরের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এই চারটি দেশ মিলে ইকনোমিক করিডর হয়ে গেলে কুনমিং পর্যন্ত আমরা যদি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি তাহলে বাণিজ্যের বিরাট সম্প্রসারণ হবে। পশ্চিম চীন পর্যন্ত আমরা সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবো।”
এ যোগাযোগ স্থাপিত হলে তা অর্থনীতিতে ‘অবদান’ রাখবে আশা করে তিনি বলেন, “সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট, ভুটানকে আমি প্রস্তাব দিয়েছি যে, তারা আমাদের এয়ারপোর্টও ব্যবহার করতে পারে। এই এয়ারপোর্টটা বিএনপি আমলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমরা আবার তা চালু করেছি এবং এটাকে আমরা আরো উন্নত করতে চাই।”
“ভূটান আমাদের প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।”
এসময় প্রধানমন্ত্রী ভারী যানবাহন চলাচল উপযোগী সড়ক ও সেতু তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।

শেয়ার