আজ ভয়াল ২৫ মে ॥ মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ৫ বছর পার

dacope
কুমারেশ বিশ্বাস, দাকোপ ॥ আজ ভয়াল ২৫ মে। উপকুল অঞ্চলের মানুষের জীবনে অভিশপ্ত একটি দিন। মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় আইলার ক্ষত আজও শুকায়নি। ২০০৯ সালের আজকের এইদিনে পৃথিবীর সর্ববৃহত ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে আঘাত হানে সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় আইলা। কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই উপকুলবাসির জীবনে ঘটে যায় স্মরণকালের ভয়াবহ এক মর্মান্তিক ধবংসযজ্ঞ। আইলার তান্ডবে মুহুর্তের মধ্যে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার উপকুলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রায় ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি তেড়ে আসে। পানির তোড়ে নিমিষেই ভেঁসে যায় নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ। মাটি আর পানিতে মিশে যায় হাজার হাজার গবাদী পশু ঘরবাড়ি ও গাছপালা। নিমিষেই গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। চিংড়ি ঘের আর ফসলের ক্ষতি হয় অবর্ননীয়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকুল রক্ষা বেড়ি বাঁধ আর ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায় শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। শতশত বছরের পুরনো এই জনপদের কোন চি‎‎হ্ণ অবশিষ্ট ছিলনা। অরিক্ষিত হয়ে পড়ে উপকুলীয় অঞ্চল। চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এই জনপদে। প্রকৃতির সৃষ্টি এই মহা বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সেদিন সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে শুরু হয় নানা তৎপরতা। আন্তর্জাতিকভাবেও সাহায্য আসতে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত উপকুলের এই জনপদে কিন্তু গত বছরেও স¤পূর্ণভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে ভেড়িবাঁধ নির্মান ও ক্লোজার আটকিয়ে দূর্গত এলাকাকে ২০১০ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি পানি মুক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে দাকোপ উপজেলার উপকুলীয় এলাকা আশংঙ্কা মুক্ত হলেও এখন ভেড়িবাঁধের উপর খুপড়ি ঘর বেধে মানবেতর জীবন যাপন করছে দুটি ইউনিয়নের ২১৫৬ পরিবারের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার দূর্গত মানুষ। এদের পুনর্বাসনে এখনো কাজ চলছে কিন্তু শ্লোতগতিতে এমন অভিমত অনেকের।

প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৫ মে দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের উপর দিয়ে আঘাত হানা ভয়ংকর আইলার মহাতান্ডবে উপকূলীয় জনপদ দাকোপ উপজেলার দুটি ইউনিয়ন কামারখোলা ও সুতারখালী ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। প্রাণ হারায় ১৬ জন, নিখোঁজ হয় ৭ জন, আহত হয় ১১ জন। নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বৃদ্ধি পায় ৮/১০ ফুটেরও বেশি। পানির তোড়ে ৩টি পোল্ডারের ৭৫.৫ কিঃমিঃ ভেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিধস্ত হয়। আংশিক ক্ষতি হয় ৪৮৭ কিঃমিঃ। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ২৯৮৩২ টি পরিবারের ১৪৭৭০০ জন মানুষ। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জমির পরিমাণ ছিল ১৬৮০ একর, আংশিক ক্ষতি হয় ১৬০০ একর। সম্পূর্ণ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় ২৫০৬৭ টি, আংশিক ক্ষতি হয় ৮৩৪৯ টি। মৃত: গবাদী পশু ও হাঁস, মুরগীর সংখ্যা ছিল ১৩৪০০ টি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে বিধস্ত হয় ১৩ টি, আংশিক ক্ষতি হয় ২৮০ টি। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ২টি ব্রীজ। এছাড়া ২৬৯৭ টি পুকুর ও ১৭৫২টি চিংড়ি তালিয়ে যাওয়ায় ভেঁসে যায় কোটি কোটি টাকার মাছ। এদিকে আইলা বিধ্বস্ত কামারখোলা, জয়নগর, ভিটেভাঙ্গা, শিবনগর, শ্রীনগর, গুনারী, সুতারখালী, কালিবাড়ি, গোলবুনিয়া, কালাবগী, নলিয়ান গ্রাম সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আইলা দূর্গত ২৭ হাজার ৬৭৬টি পরিবারের মধ্যে এখনো ২১৫৬ টি পরিবারের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার দূর্গত মানুষ ভিটেবাড়িতে ফিরতে পারেনি। আইলায় সম্পুর্ণ গ্রাস করায় তারা ভেড়িবাঁধের উপর খুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকার পূনর্বাসনে আন্তরিক না হলে আর কোনদিনই হয়তো তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটিতে ফেরা হবে না। দূর্গতদের কর্ম সংস্থান নেই, ঘরে চাল নেই, খাবার পানির তীব্র সংকট, নেই স্যানিটেশন ও চিকিৎসা ব্যবস্থা। দূর্গত মানুষের ভাগ্যে কি আছে এখনও তারা জানে না।
অব্যবস্থাপনা : মহা এই মানবিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে প্রথম থেকেই নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার চিত্র চোখে পড়ে। যেকারণে পূনর্বাসনের জন্য সরকারের দেয়া ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় তৈরি অধিকাংশ পাকা ঘরে মানুষের পরিবর্তে গরু, ছাগল, হাঁস মুরগী বাস করছে। দূর্গত এলাকার শতভাগ মানুষ শ্রমিক হলেও কোথাও শ্রম বিক্রির জায়গা না থাকায় তারা জীবন জীবিকার সন্ধানে ভারত সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাড়ি দিচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সামান্য সংখ্যক শ্রমিক কাবিখা ও ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচীর সাথে জড়িত রয়েছে। এছাড়া দূর্গত এলাকায় ওএম, এসের চাল বিক্রি ও ভিজিএফ’র চাল দেয়া বন্ধ রয়েছে। গৃহ নির্মানের ২০ হাজার টাকা পরিবার প্রতি বিতরণ করলেও সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন না করায় গৃহনির্মান কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারী গ্রামের কৃষক বাসুদেব মন্ডল জানান আইলায় তার ঘরবাড়ি ফসলি জমি সবকিছুই শিবসা নদীতে বিলিন হয়েছে। এখন পাশ্ববর্তী ভেড়িবাঁধের উপর পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। দীর্ঘ ২/৩ বছর আমার ফসলি জমিতে আমন ধান উৎপাদন করতে না পারায় সংসারে অভাব অনটন দেখা দিয়েছে। এখন এলাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ৫নং সুতারখালী ইউপি চেয়ারম্যান জিএম আশরাফ হোসেন জানান দেখতে দেখতে আইলার ৫টি বছর কেটে গেল। নলিয়ান নদীতে ও কালাবগী জুলন্ত পাড়া এলাকায় বাঁধ না হওয়ায় এখনও পর্যন্ত ১৯শ পরিবারের দূগর্ত মানুষ তাদের পূর্বের জীবন যাত্রায় ফিরতে পারেনি। তারা চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি সরকারের নিকট নদী ভাঙ্গন ও দূর্যোগ মোকাবেলায় টেশসই ভেড়িবাঁধ নির্মানের দাবি জানান। উপজেলার ৬নং কামারখোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উমাশংকর রায় জানান, ইউনিয়নের মাত্র ৩০ ভাগ মানুষ স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার করছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা এ অঞ্চলে নেই বললে চলে, কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নে হাতে গোনা কয়টি পুকুরের পানি পান করার উপযুক্ত। ৮/১০ কিঃমিঃ দূর থেকে দৈনিকের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। অনেকেই নৌকা অথবা ট্রলার যোগে নদীপথে ১৫/১৬ কিঃমিঃ পাড়ি দিয়ে দাকোপ ও কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়ন থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। আবার কেউ কেউ শিবসা নদী পাড়ি দিয়ে হড্ডা ইউনিয়ন থেকে পুকুরের পানি সংগ্রহ করে। এছাড়া চাষীদের চাষাবাদের সরঞ্জামাদি না থাকায় আগামী আমন মৌসুমে কি দিয়ে তারা চাষাবাদ করে ফসল ফলাবে এ নিয়ে এলাকার কৃষকরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। তিনি সরকারের নিকট কামারখোলা ইউনিয়নে ভেড়িবাঁধের উপর বসবাসরত ২৫৬ পরিবারের পূনরবাসনের ব্যাবস্থা করার দাবি জানান। দাকোপ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেলিম খানের বক্তব্য : আইলার পর থেকে এ যাবতকাল পর্যন্ত সরকারি অনুদান হিসেবে কামারখোলা ও সুতারখালী ২টি ইউনিয়নের দূর্গতদের গৃহ নির্মানের জন্য দেয়া হয়েছে ২১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয় ২টি সাইক্লোন শেল্টার যার নির্মান কাজ চলমান। ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে দেয়া হয়েছে ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। ২১ লাখ টাকা ব্যয় ১টি ব্রীজ করা হয়েছে। জলবায়ু ট্যাষ্ট ফান্ড থেকে ১১-১২ অর্থ বছরে ৩শ‘টি পাকা ঘর ও ২৫টি টিনের ঘর দেওয়া হয়েছে যার ব্যয় সোয়া ৫ কোটি টাকা। ইতি পূর্বে ওই ঘরগুলি সুবিধাভোগীদের হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ১০৮১ মেঃ টন টিআর ও কাবিখার চাউল দিয়ে এলাকার উন্নয়ন করা হয়েছে। তাছাড়া সরকারের রুটিন ওয়ার্কে খাল খনন, পুকুর খননসহ এলাকার উন্নয়ন কাজ চলছে এবং ওই এলাকায় বিভিন্ন এনজিও পৃথক পৃথক ভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে দূর্গতদের সাহায্য ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা থেকে আব্দুল জলিল জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতা বেগের জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকুলীয় অঞ্চলে। এসময় তিনটি ইউনিয়নের ৭৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়। ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। এ অঞ্চলে ১৪টি গ্রামের মধ্যে মাত্র তিনটি গ্রামের টিউবওয়েল সফল হলেও ১১টি গ্রামের কোনো টিউবওয়েল সফল হয়নি। উচ্চ বিত্ত থেকে শুরু করে নিম্মবিত্ত সবাই চালাচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বেকারত্বের কারনে কাজের সন্ধানে মানুষ নিজ বাসভুমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্রে। সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল ওই এলাকার মানুষের জীবন যাপন এখন দূর্বিসহ হয়ে পড়েছে। আইলার পরপরই কিছু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কাজের বিনিময় খাদ্য প্রকল্পের কাজ হলেও এখন আর কোনো কাজ হচ্ছে না। ক্রমে বাড়ছে দরিদ্র ও অতি দরিদ্রের সংখ্যা। আইলার পর ৫ বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় এখনও ঝূঁকিতে রয়েছে এ জনপদের মানুষ। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন পাঠদানের উপযোগি হয়নি।

এখনও ঘুরে দাঁড়াতে সংগ্রাম করছে
সাতক্ষীরার লক্ষাধিক মানুষ

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা ॥ ঘূর্নিঝড় আইলার আঘাতে তছনছ হয়ে যাওয়া সুন্দরবন ঘেষা শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের হাহাকার কমেনি। এলাকায় নেই কোন কর্মসংস্থান। সুপেয় জলের অভাব তীব্র। অর্থের অভাবে ঘর নির্মান করতে না পারায় বেড়ীবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন অনেকেই। বেঁড়ীবাধের অবস্থাও সঙ্গীন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিও সংস্কারের অভাবে পাঠদান কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আইলার আঘাতের পর থেকে এখনো গোটা এলাকা উদ্ভিদ শুন্য হয়ে আছে। লবাক্ততার কারনে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। ফলে গোটা এলাকাজুড়ে তীব্র কর্মসংস্থানের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কর্মহীন মানুষ এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যাচ্ছে। সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর উপর নির্ভরশীল ওই এলাকার মানুষের জীবন যাপন এখন দূর্বিসহ হয়ে পড়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের অভাব-অনটন বেড়েই চলেছে। ক্রমে বাড়ছে দরিদ্র ও অতি দরিদ্রের সংখ্যা। এছাড়া বনদস্যুদের অত্যাচারে সুন্দরবন নির্ভর মানুষগুলিও কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অপহরনের ভয়ে তারা সুন্দরবনে মধু আহরন ও কাঁকড়া সংগ্রহে যেতে পারছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলিও ঝুকির মধ্যে। পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকাটি নামক স্থানে বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে জনবসতি গ্রাস করছে। এছাড়া বুড়িগোয়ালিনী,হরিনগরসহ প্রায় একশ’ কিঃ মিঃ বেড়ীবাঁধ হুমকির মুখে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কামালকাটি এলাকায় বেড়ীবাঁধ সংস্কারের কাজ চললেও অন্যান্য বাঁধ গুলি হুমকির মুখে। তবে অর্থাভাবে এখুনি কোন প্রকল্প গ্রহন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম। আইলার পর থেকে খাবার পানির তীব্র সংকট ভূগছেন উপকূলীয় এলাকার মানুষ। গাবুরা ইউনিয়নের ১৫ টি গ্রামের মধ্যে ১৩টি গ্রামের মানুষদের খাবার পানির একমাত্র উৎস ‘পুকুর’। অনেকে মহিলাই ২/৩ কিঃমিঃ পাঁয়ে হেটে এক কলস পানি আনেন। নোংরা আবর্জনায় পরিপুর্ন হওয়ায়,এসব পানি পান করে রোগাক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। কিছুটা স্বচ্ছল লোকেরা বিশ টাকা দরে পানির ড্রাম পাশের উপজেলা কয়রা থেকে কিনে আনছেন। এবিষয়ে সাতক্ষীরার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আহমেদ বলেন, ইউনিসেপের কয়েকটি প্রকল্প চালু হওয়ার আগে সবার জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। খলষেবনিয়া এলাকায় ক্লোজার বেড়ীবাঁধের ওপর বসবাসকারী শতাধিক মানুষ অত্যন্ত ঝুকির মধ্যে বসবাস করছে। অর্থাভাবে তারা পিতৃভিটায় ফিরে যেয়ে ঘর তৈরী করতে পারছে না। শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের আবিদুর রহমান জানান, আইলা দুর্গত এলাকায় আশির দশক থেকে লবন পানির চিংড়ি চাষ ছাড়া আর কিছুই হয়না। আইলার পর পাউবোর বেড়িবাঁধ কেটে নদীর পানি চিংড়ি ঘেরে উঠাতে দিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। ফলে এলাকায় না হচ্ছে চিংড়ি চাষ, না হচ্ছে কোন ফসল। ফলে মানুষের হাতে কোন কাজ না থাকায় বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। চকবারা ক্লোজার সংলগ্ন নদীতে নেট জাল দিয়ে রেণু সংগ্রহ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে ২০১৩ সালে কোষ্টগার্ড জাল দিয়ে রেনু ও পোনা সংগ্রহ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায়, ওই সব এলাকার লোকজন একেবারে বেকার হয়ে পড়েছে। গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুর আলম জানান, পয়সার অভাবে ঘর বাঁধতে না পারায় অনেকেই এখনও বাঁধের উপর বসবাস করছে। এলাকায় ফসল উৎপাদন ও মৎস্য চাষ বন্ধ থাকায় কারও কোন আয় উপার্জন নেই। তিনি আরো বলেন, আইলার পর জলদস্যুর অত্যাচারে জেলে-বাওয়ালীরা সুন্দরবনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এলাকায় কোন কাজ না থাকায় বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তিনি উপকুলীয় এলাকার বিভিন্ন সংকট সমাধানে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

আজকের দিনটি স্বজন হারানোর
কথা মনে করিয়ে দেয়
সুভাষ দত্ত, কয়রা ॥ উপকুলবাসীর জন্য আজকের এই দিনটি অভিশপ্ত একটি দিন। দিনটির কথা মনে করলে ভয়ে শিউরে ওঠে উপকুলবাসির। স্বজন হারানোদের মনে করিয়ে দেয় তাদের প্রিয়জনের কথা, কবর দেয়ার জায়গার অভাবে অনেকের লাশ শিয়াল কুকুরে ছিড়ে খেয়েছে। কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকলেও এখনো পর্যন্ত সেই ক্ষতি পুষিয়ে উপকুল এলাকায় গড়ে ওঠেনি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিবছর মে মাস এলেই উপকুলের লাখ লাখ মানুষ আতঙ্কে থাকেন। কোন রকম জোড়া তালি দেয়া পাউবোর বেড়ি বাধের অবস্থা এতই নাজুক যেন তেন দুর্যোগ এলেই বাধ ভেঙে আবারও বিপদ ঘটাতে পারে। নেই বেড়ি বাধ, নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়স্থলে ছুটে যাওয়ার নেই কোন ব্যাবস্থা। ৫ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি অনেক প্রতিশ্র“তি। নির্মাণ হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। আইলা পরবর্তী কয়রা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন প্রতিশ্র“তির মধ্যে অন্যতম ছিল উপকুলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাাঁধ নির্মান করে বাধের পার্শে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা কিন্ত ৫ বছর পার হলেও টেকসই বাাঁধ নির্মান হয়নি। বিগত ৫ বছরে পাউবোর বরাদ্দ কৃত অর্থের সিংহভাগ লুটপাট হয়েছে। কতিপয় পাউবো কর্মকর্তা আর ৪/৫ জনের একটি প্রভাবশালী চক্র কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তৈরি করে প্রক্কলীত ব্যায় কয়েক গুন বেশি দেখিয়ে বরাদ্দ কৃত অর্থ লুটপাট করেই চলেছে। এলাকাবাসির মনে দুর্যোগ আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। ঘুর্নিঝড় আইলার ৫ বছর অতিবাহিত হলেও উপজেলার ১৩০ কিঃমিঃ পাউবোর ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ,স্লুইজ গেট নির্মাণ-পুননির্মান, বাধের উচ্চতা বৃদ্ধির কাজ সম্পন্ন হয়নি। স্থানীয় গ্রামিন অবকাঠামো সোজা হয়ে দাড়াতে পারেনি এখানেও বরাদ্দ কৃত অর্থের শিংহ ভাগ লোপাট অব্যাহত রয়েছে। অধিকাংশ স্থানে খাবার পানির তিব্র সংকট রয়েই গেছে। স্যানিটেশন ব্যাবস্থার উন্নতী হলেও জনবল সংকট, দুনীর্তির কারনে স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। ক্ষতি গ্রস্থ ১৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংষ্কার কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। সংষ্কার ও রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্র ঝুকিপুর্ন হয়ে পড়েছে। এসব কেন্দ্রে মানুষের বসবাস কিংবা আশ্রয় গ্রহন নিরাপদ নয় বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। অতিসত্তর আইলা কবলিত এই এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ-পুননির্মাণ, সংষ্কার ও উপকুলীয় অরক্ষিত বেড়িবাধ দ্রুত মেরামত করে ও পাউবোর বাধ থেকে অবৈধ পাইপ গেট তুলে দিয়ে উপকুলবাসীকে দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের এমপি এ্যাডঃ শেখ মোঃ নুরুল হক জানান, আইলার প্রলয়ংকারী ঘুর্নিঝড়ের পরে বেড়িবাঁধগুলো যেভাবে সংষ্কার হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। বাধগুলি বর্তমানে ঝুকিপুর্ন অবস্থায় রয়েছে। যে কোন সময় ঘুর্নিঝড় জলচ্ছাস হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী, পানি সম্পদমন্ত্রী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণমন্ত্রীকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন এই এমপি। জলবায়ু তহবিল থেকে যে অর্থ আসে সেখান থেকে উপকুলের মানুষকে বাঁচাতে বেড়িবাধ ও সাইক্লোন সেল্টার নির্মাাণে বরাদ্দের দাবি করেছেন সচেতনমহল।

শেয়ার