দিল্লির মসনদে মদি ॥ বিজেপি’র এনডিএ জোট ৩৩৮ আসনে ও কংগ্রেসের ইউপিএ জোট ৫৮ তে জয়ী

modi
সমাজের কথা ডেস্ক॥ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ভারতে সরকার গঠন করতে চলেছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। আর এর মধ্য দিয়ে প্রায় তিন দশক পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে কোনো জোট।
ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল পাওয়া গেছে। ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বেলা সোয়া ১২টা নাগাদ ৫৪৩টি আসনেরই খসড়া ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
এতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ ৩৩৮ আসনে জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিপরীতে মাত্র ৫৮ আসন পেয়ে ভরাডুবি হয়েছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ’র। অবশিষ্ট সব দলের প্রার্থীরা মিলে পেয়েছে ১৪৭ আসন। বিজেপি একাই জিতেছে ২৮৪ আসনে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য কুখ্যাত গুজরাট প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে বিজেপির ভোটযুদ্ধে বিপুল বিজয়ের খবরে কট্টরপন্থী এই নেতার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে আর কোন বাধা থাকল না।
ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস জোট ৫৩৩ আসনের মধ্যে ৪১৪টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে কেন্দ্রে।
এরপর দিল্লিতে প্রতিটি সরকার গঠিত হয়েছে আঞ্চলিক ও জাতপাতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দলের সমর্থনে, যাদের মধ্যে সমঝোতার অভাবে কয়েকটি সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই ভেঙে যায়।
এনডিটিভি জানিয়েছে, ৫৪৩টি আসনের মধ্যে এনডিএ জোট ৩৩৮টি আসনে জিতেছে, যার মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছে ২৮৪টি আসনে।
বিজেপির জোটসঙ্গী ‘কট্টর হিন্দুত্ববাদী’ রাজনৈতিক সংগঠন শিব সেনা এগিয়ে রয়েছে ১৯টি আসনে, বিজেপির আরেক জোটসঙ্গী অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি এগিয়ে রয়েছে ১৩টি আসনে।
শুক্রবার দিল্লিতে লোকসভার ৭ টি আসনেই এগিয়ে গেছে বিজেপি। আম আদমি পার্টি আছে দ্বিতীয় অবস্থানে আর কংগ্রেস তৃতীয় অবস্থানে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দুইবার নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী এবং ইউনিয়ন মন্ত্রী কপিল সিবালও এবার চাঁদনি চক আসন থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন। একই আসনে এএপি প্রার্থী আশুতোশকে পেছনে ফেলে ৫২ হাজারেরও বেশি ভোটে এগিয়ে গেছেন দিল্লি বিজেপি প্রধান হর্ষ বর্ধন।
১০ বছর ভারত শাসন করার পর জনপ্রিয়তা কমে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট জিতেছে মাত্র ৫৮টি আসনে, যার মধ্যে কংগ্রেসের রয়েছে ৪৬টি আসন। নয়াদিল্লির আসনে কংগ্রেস প্রার্থী অজয় চলে গেছেন তৃতীয় অবস্থানে।
দিল্লির উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের আসনেও এগিয়ে বিজেপি’র উদিত রাজ। আর কংগ্রেসের কৃষ্ণ তিরথকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে এএপি’র রাখি বিরলা।
ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফল করছে মতিলাল নেহেরুর হাতে গড়া গান্ধী-নেহেরু-ইন্দিরার দল কংগ্রেস। সর্বভারতীয় দলগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে বামপন্থীদেরও।
আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি, বিহারের নীতিশ কুমারের জনতা দলের জনপ্রিয়তায় ধস নামলেও ভোটে এগিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ও তামিলনাড়ুর জয়ললিতার এআইএডিএমকের। তৃণমূল কংগ্রেস ৩৪টি আসনে এবং এআইএডিএমকে ৩৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। ভারতের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত নয়টি ধাপে ভোট গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনে অংশ নেন ৮ হাজার ২৫১ জন প্রার্থী। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টি আসন।
নির্বাচন শেষে অধিকাংশ বুথ ফেরত জরিপে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল।
১০ বছরে ইউপিএ শাসনে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার সমালোচনার মুখে পড়ে কংগ্রেস। বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মনমমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রী থাকার দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
নরসীমা রাওয়ের অর্থমন্ত্রী থাকার সংস্কারের সূচনা করে ভারতের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মনমোহন।
অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই ইস্যু করে নরেন্দ্র মোদি তার প্রচারণা চালান। ভবিষ্যতে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গুজরাটে শিল্পায়নের দৃষ্টান্ত টেনে তরুণ ভারতীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গুজরাট উন্নয়নের মডেলকে সামনে রেখে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিসর থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের টপকে অনেকটা আকস্মিকভাবে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে চলে আসেন মোদি।
‘আগ্রাসি নেতৃত্বগুণে’ নিজের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগ ঢেকে জাত-পাত ও ধর্মীয় রাজনীতিতে বিভক্ত ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
মোদির গুজরাট উন্নয়ন মডেলের সমালোচনা করে প্রচার চালিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অভিযোগ, মোদি গুঁটি কয়েক ব্যবসায়ীকে বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। তারপরও ভারতবাসীর কাছে ভবিষ্যত অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকার হয়ে দাঁড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।
তাই মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন- এমন গুঞ্জনের মধ্যে হু হু করে বাড়ছে ভারতের শেয়ারবাজার। ফল প্রকাশের দিন মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক প্রায় এক হাজার পয়েন্ট বেড়ে ২৫ হাজার অতিক্রম করেছে, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

শেয়ার