যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে পলাতক ৬ বন্দির খোঁজ মেলেনি ॥ বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জন

jessore kishor unnoion kendro
লাবুয়াল হক রিপন॥
গত ২৪ ঘন্টা পার হলেও পুলিশ খোঁজ মেলাতে পারেনি যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়া ৬ বন্দি কিশোরের। শনিবার রাতে নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একযোগে প্রাচীর টপকে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তাসহ দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে এই কেন্দ্র থেকে মোট ৮ কিশোর পালালো। তবে পুরো বিষয়টি রহস্যজনক এমন অভিযোগ অনেকের। তবে আটককৃতদের মুখ থেকে পুলিশ কোন ক্লু বের করতে পারেনি। তাদের দাবি গার্ড সংকটের কারণে এধরণের ঘটনা ঘটছে। এখানে গার্ডের ৮টি পদ থাকলেও মাত্র দু’জন কর্মরত আছেন। ৬টি পদ দির্ঘদিন ধরেই শূন্য রয়েছে। এদিকে পলাতক শিশু অপরাধীদের সম্পর্কে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এদের অনেকে হত্যাকান্ডের আসামি এবং কেন্দ্রে বিদ্রোহ করার অভিযোগে কিছুদিন আগে তাদের টঙ্গী থেকে যশোরে পাঠানো হয়। এখানেও তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে অনেকবার। একারণে তাদের খুন করে গুম করা হতে পারে এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে নানা মহল থেকে। এসব মাথায় নিয়েই পুরো ঘটনার তদন্ত দরকার বলে মনে করছেন সচেতনমহল।
জানা যায় শনিবার রাতে কেন্দ্রের প্রাচীর ঘেঁষে পাইপ নামিয়ে নড়াইল জেলার নড়াগাতি থানার বাওঐসোনা গ্রামের মুজাহিদ মোল্লার ছেলে বাপ্পী (১৭), বগুড়া সদর উপজেলার ছোট কুমিরা গ্রামের পশ্চিমপাড়ার বেলাল হোসেনের ছেলে রনি ওরফে জীবন (১৬) ও দুলাল প্রামানিকের ছেলে আব্দুর রহমান ওরফে কাইল্যা (১৮), একই উপজেলার দক্ষিণ ফুলবাড়িয়া গ্রামের মোজাম্মেল হকের ছেলে আশিকুর রহমান আশিক (১৮) ও সাইফুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ আলী জিসান (১৬) এবং ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার ব্রাক্ষ্মনগাও গ্রামের ফজর আলীর ছেলে জুনাইদ (১৮) পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে বগুড়ার ৪ জন একটি হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি। এছাড়া এদের মধ্যে, নড়াইলের বাপ্পী, বগুড়ার জীবন ও জিসান এবং ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার জুনাইদকে কয়েকমাস আগে টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে যশোরে পাঠানো হয়। কেন্দ্রে বিদ্রোহ করার অভিযোগে তাদের যশোরে পাঠানো হয় বলে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে দাবি করা হয়েছে। যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী সুপার আবুল বাশার শেখ জানান, শনিবার রাতে সাইফুল ইসলাম নামে এক নিরাপত্তার্মী দায়িত্বে ছিলেন। রাত ৮টা ২৯ মিনিটে সাইফুল ইসলাম সহকারী সুপারকে মোবাইল ফোনে জানায় ৬ বন্দি কিশোরকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি দ্রুত কেন্দ্রে ছুটে এসে আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালান। কিন্তু তাদের খোঁজ না পেয়ে বিষয়টি পুলিশসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। শনিবার রাতে প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন গার্ড সাইফুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম। এদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইনচার্জ নূর ইসলাম নামে এক কর্মকর্তা। কিন্তু ঘটনার সময় গার্ড সাইফুলের দায়িত্ব ছিল বন্দি কিশোর ভবনের মেইন গেটে। ওই সময় সাইফুল ব্যক্তিগত কাজে সেখান থেকে বাইরে চলে যায়। পাশাপাশি গার্ড সিরাজুল ইসলামও আশপাশ দিয়ে ঘুরাফেরা করছিলেন। এই সুযোগে পলাতকরা ভবন থেকে প্রায় ১৬ ফুট লম্বা একটি আরসিসি পাইপ জোগাড় করে তাই বেয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যায়। তবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রায় অধিকাংশের বিরুদ্ধে। এদিকে এঘটনায় প্রশাসনে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যান যশোরের জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রাতভর পুলিশ ওই কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও কারোর খোঁজ মেলাতে পারেনি। দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে রোববার ওই কেন্দ্রের গার্ড ইনচার্জ নূর ইসলাম ও গার্ড সিরাজুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ থানায় নিয়ে আসে। যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক শেখ শাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, প্রায় দেড় বছর তিনি এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন। এ পর্যন্ত তিনবার বন্দি কিশোর পালিয়েছে। গার্ড সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে কিশোররা পালিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই কেন্দ্রে ৮ জন গার্ড থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছে মাত্র দু’জন। ওয়ার্ডারের পদ ৬টির স্থানে আছে মাত্র ৪ জন। এর মধ্যে সাফায়েত নামে এক ওয়ার্ডারের বিরুদ্ধে বন্দি কিশোরদের সাথে ২০১৩ সালের প্রথম দিকে বলাৎকারের ঘটনা ঘটে। প্রসঙ্গত, এরআগে গত ৪ মে যশোর শিশু ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পুলিশের সাথে কিশোরদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বন্দি কিশোররা ওই কেন্দ্রের মধ্যে ভাংচুর চালায়। খাবারের নি¤œমান, কিশোরদের ওপর নির্যাতন চালানোসহ নানা অভিযোগে কিশোররা আন্দোলন শুরু করলে সংঘর্ষের সুত্রপাত ঘটে। ওইসময় নাজমুল ও নাঈম নামে দু’কিশোর পালিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে ওই ঘটনার পর সংঘর্ষে জড়ানো কিশোরদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে কিশোরদের মাঝে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ কারণে তাদের মনে চাপা ক্ষোভ ছিল। পালিয়ে তার প্রতিশোধ নিয়েছে বলে মন্তব্য অনেকের। এদিকে প্রশ্ন উঠেছে তাদের বিদ্রোহের ঘটনায় হত্যার পর গুম করে পালানোর প্রচার দেয়া হচ্ছে কিনা। এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ঘটনার তদন্তের দাবি করেছেন অনেকে। সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন পলাতক বন্দি কিশোরদের বিভিন্ন স্থানে খোজ করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

শেয়ার