যশোরে রত্নগর্ভা ৬ মাকে সম্মাননা

ma gift
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই’ কবির একথা সন্তানের কাছে চিরসত্য হয়ে রয়েছে। তাই মমতাময়ী মাকে প্রতিটি মুহূর্তে সেবা যতœ ও ভালোবাসা হলেও আনুষ্ঠানিক সম্মান জানানোর জন্য প্রতিবছরের মতো যশোরে এবারও বিশ্ব মা দিবস পালন করা হয়েছে। আর দিবসটিতে যশোরের ৬ রত্নগর্ভা মাকে সম্মাননা ও মা সমাবেশ করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন শেকড়। যশোর পৌরসভার সার্বিক তত্ত্বাবধানে গতকাল শহরের টাউল হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চে এ সংবর্ধনা দেয়া হয়। এরমধ্যে ঊষা রানী ভট্টাচার্য্যকে মরনোত্তর এবং মিসেস রেবেকা সুলতানা, আমিনা আহমেদ, ফৌজিয়া বেগম কবিতা, আমেনা বেগম ও আলহাজ ফাতেমা জালালকে জীবদ্দশায় সংবর্ধিত করা হয়েছে। গুণী এই ‘মা’দের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়েছেন দেশের খ্যাতিমান নজরুল সঙ্গীত শিল্পী একুশে পদকপ্রাপ্ত ফাতেমা-তুজ জোহরা। প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি জীবিতদের হাতে এবং মৃত ঊষা রানীর পরিবারের সব সদস্যদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন। পৌর মেয়র মারুফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান, যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল আলম, গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, আজমি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের সত্ত্বাধিকারী আসাদুজ্জামান মিঠু। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শেকড় যশোরের পরিচালক রওশন আরা রাশু। সমাজকর্মী মিনারা খন্দকারের পরিচালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুরবিতান সভাপতি আবু সালেহ তোতা, সম্মিলিত সাংকৃতিক জোটের সভাপতি হারুণ অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক সুকুমার দাস, নারী নেত্রী হাবিবা শেফা প্রমুখ।
৬ রতœগর্ভা মায়েদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও জীবনী
ঊষা রাণী ভট্টাচার্য্য (মরণোত্তর) :
এ রতœগর্ভা মা ১৯২৫ সালে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার রুদাঘরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা স্কুল শিক্ষক হরিপদ ভট্টাচার্য্য ও মা শোভা রানী ভট্টাচার্য্য। স্বামী মণিরামপুর নিবাসী সুধীর কুমার ভট্টাচার্য্য। তার সাত সন্তানরা হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, সবিতা ব্যানার্জি, কবিতা চক্রবর্তী, বর্তমান সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টচার্য্য চাঁদ, অরুন ভট্টাচার্য্য, বরুন ভট্টাচার্য্য ও রতœা চক্রবর্তী। তিনি ২০০৬ সালের ৩১ মার্চ পরলোকগমন করেন।
মিসেস রেবেকা সুলতানা:
এ রতœগর্ভা মা ১৯৪৭ সালের ১৩ মে ঝিনাইদহ জেলার নলডাঙা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম সৈয়দ বদরুদ্দীন আহমেদ ও মাতা মরহুম আঞ্জুমান নেছা। তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর এসএসসি পাস করেন। শিক্ষকতা পেশায় থাকা অবস্থায় তিনি পিটিআই পাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি তিন সন্তানের জননী হয়েও যশোর সিটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। তার তিন সন্তান হলেন, নজরুল ইন্সটিটিউটের উপ-পরিচালক কবি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রেজাউদ্দিন স্টালিন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও কবি সুহিতা সুলতানা এবং চিত্রশিল্পী ও গবেষক ডক্টর সেতারা এলিন। তার প্রাপ্ত পুরস্কার সমূহ হলো আজাদ প্রডাক্ট রত্মগর্ভা রতœগর্ভা, মা অ্যাওয়ার্ড (১৩ মে, ২০১২), জয়িতা ২০১৩ বিষয়-সফল জননী। ১৯৮২ সালে ভিডিপির শেষ্ঠ পরিচালিকা হন।
আমিনা আহমেদঃ
কোলকাতার হাওড়া জেলার শিবপুরে ১৯৪৬ সালে আমিনা আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার এআরএম ইনামুল হক ও মাতা-মরহুমা নাজেরা বেগম। তিনি লালমাটিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৬৯ সালে পুরাতন কসবা নিবাসী কাজী শাহেদ আহমেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম সন্তান কাজী নাবিল আহমেদ বর্তমান যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য।
দ্বিতীয় সন্তান সাহিত্যিক ও লেখক ড. কাজী আনিস আহমেদ এবং তৃতীয় সন্তান বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সম্মানিত পরিচালক কাজী ইমাম আহমেদ।
ফৌজিয়া বেগম কবিতাঃ
তিনি বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিন বছর বয়সে তার বাবাকে হারালে চৌগাছার জগদীশপুর নানা বাড়ি, পরে যশোর শহরের পুরাতন কসবায় বড় হয়ে ওঠেন।
তার প্রথম সন্তান সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আরএমও ডাঃ এএসএম মারুফ হাসান রাজা, দ্বিতীয় সন্তান নাজনীন নাহার মিতা, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯২ সালে মারা যান। তৃতীয় সন্তান দুবাই সেলুলা মোবাইল কোম্পানির প্রকৌশলী এএসএস তারিক হাসান লিটন, চতুর্থ সন্তান গোল্ডেন ঈগল কিন্ডার গার্ডেনের শিক্ষিকা জেসমিন নাহার টপি-অর্থনীতিতে এমএ।
আমেনা বেগমঃ
১৯৩৯ সালে যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি গ্রামে জন্ম হয় আমেনা বেগমের। তার বাবা মৃত সামছুদ্দীন বিশ্বাস ও মা মৃত সুখজান বেগম। তিনি গ্রামের বৈঠক খানায় পাঠশালা শেষ করে মাত্র ১৪ বছর বয়সে এয়াকুব আলী লস্করের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
তার প্রথম সন্তান ব্র্যাকের সাবেক আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন, দ্বিতীয় সন্তান পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনের ম্যানজার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, তৃতীয় সন্তান মশিউর নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আনোয়ারা খাতুন, চতুর্থ সন্তান শাহবাজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক সোহরব হোসেন, পঞ্চম সন্তান মানিকগঞ্জ ব্র্যাকের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনউদ্দীন, ৬ষ্ঠ সন্তান ফরিদপুর বিএডিসি’র উপ সহকারী পরিচালক এমএ জাকের, সপ্তম সন্তান কোটচাঁদপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার জহির উদ্দীন, অষ্টম সন্তান যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য অফিসের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মুসলিমা আক্তার মিলি এবং নবম সন্তান ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া তিতাস গ্যাস ফিল্ডের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী।
আলহাজ ফাতেমা জালাল ঃ ১৯৪৮ সালে বোয়ালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঝিকরগাছা থানার ছোট পোদাউলিয়া গ্রামের শিক্ষক জালাল উদ্দিনের সাথে তার বিবাহ হয়। তিনি চার সন্তানের জননী।
তার প্রথম সন্তান হলেন ড. একেএম আকতারুজ্জামান কবির-আইনে পিএইচডি ডিগ্রিধারী, দ্বিতীয় সন্তান ডাঃ এবিএম কামরুল হাসান ব্রুনাইএ একটি হাসপাতালে কর্মরত, তৃতীয় সন্তান মতিয়া সুলতানা লিপি শিক্ষকতা পেশায় এবং চতুর্থ সন্তান শাহানা সুলতানা সরকারি কর্মকর্তা ।

শেয়ার