বৃদ্ধা মায়েরা এখনো পরিবারে উপেক্ষিত ॥ ১৫০ জনের পাশে জয়তী সোসাইটি

joity
তবিবর রহমান ॥
‘নানা রকম জিনিস আর আসবা নামি দামি, সবচে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি’ সংগীত শিল্পী নসিকেতার বিখ্যাত এ গানের লাইনের মতো বাস্তবে মিল রয়েছে বেলা দত্তের (৬৫) জীবনে। এ বৃদ্ধা মায়ের চার ছেলে থেকেও যেন নেই। ছোট ছেলে বেকার আর বড় তিন ছেলে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটালেও অনাদরে রয়েছেন এ বৃদ্ধা। থাকেন অনাহারে-অর্ধাহারে। অথচ তার ছেলেরাই বৃদ্ধা মায়ের সামনে খাচ্ছেন পেটপুরে। বউদের আঁচলে লুকানো তার তিন ছেলে তাই মাকে ভাত খাওয়ার কথা বলা যেন বন্ধই করে দিয়েছেন। তাই কোমরে ব্যাথার যন্ত্রণা থাকলেও এ নরাীর মনের গভীরে থাকা ব্যাথার কাছে যেন সামান্যই। ছেলেদের বিবেকের আত্মহত্যা হয়েছে ভেবে বৃদ্ধা বেলা দত্ত শুধুই কপাল চাপড়ান।
আর এক বৃদ্ধা রাধা রানী (৭০)। ষষ্ঠীতলার বুনোপাড়ার বাসিন্দা এ নারীর স্বামী মারা গেছে। এক ছেলে থাকলেও কাজ করে না। তাই এ বয়সেও তাকে রুটি রুজির সন্ধানে বের হতে হয়। তিনি এখনও ইট ভাঙ্গার কাজ করেন। কখনও ঝিয়ের কাজ করেন অন্যের বাসায়।
শুধু বেলা দত্ত কিংবা রাধা রানী নয়। যশোর শহরে এ রকম ১৫০ বৃদ্ধার জীবনে রয়েছে করুণ কাহিনী। জীবনের শেষ সময়ে এসে তারা এখন পরিবার ও পরিজনের কাছে অবহেলা-করুনার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন। মমতার আঁচলে ও ভালবাসার পরশে যে সন্তান বড় হয়েছে সেই ছেলেই দূরে ঠেলে দিয়ে গর্ভধারিনী মাকে। তাদের ‘মা’ অসুস্থ কিংবা শীতে কাতর হয়ে বারান্দার এককোনে কাতরালেও একটু উঁকিও দিচ্ছে না। এরকম দু’খিনী বৃদ্ধা মায়ের সন্ধান করে বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা আর কিছু সাহায্যে সহযোগিতা করে দুঃখ লাঘবের চেষ্ঠা করছে যশোরের নারীদের সংগঠন জয়তী। তারা পুরাতন কাপড়-চোপড় সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে তাদের সামর্থ অনুযায়ী চাল, টাকা, ওষুধ কিনে দিচ্ছে। কখনও এসেবায় অর্থের জন্য হাত পাতছে সমাজের বিত্তবান মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে। তাদের এ প্রশংসনীয় উদ্যোগে এগিয়েও আসছে কেউ কেউ।
জানা যায়, বৃদ্ধাশ্রম নয়, নিজ বাড়িতেই নারীদের সেবা দেয়ার প্রত্যয়ে ২০০৮ সাল থেকে জয়তী সোসাইটি নারীদের জন্য সেবা প্রকল্প চালু করে। ‘আপনার একটু সহযোগিতায় একজন অসহায় মায়ের মুখে হাসি ফুটতে পারে’ এ বিশ্বাসে তারা ৬ বছর ধরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য একটাই ৫০ উর্ধ্ব নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করানো। এজন্য আর্থিক সহায়তা, কাউন্সিলিং করানো এবং ভ্রমণ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও স্বজনদের মতবিনিময় করছে।
জয়তী সোসাইটির পরিচালক অর্চনা বিশ্বাস বলেন, বৃদ্ধা নারীদের ১৫ দিন পরপর জয়তী ভবনে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আমির হোসেন তাদের ফ্রি ব্যবস্থাপত্র দেন এবং আর সাধ্যমত ওষুধ কিনে দেয়া হয় সংস্থার পক্ষ থেকে। আর প্যারালাইসিস বা স্টোক করলে তাদের বাড়ি গিয়েই সেবা করে আসা হয়। এছাড়া সপ্তাহে তিন দিন ফিজিওথেরাপি, মেডিটেশন ও কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা করা। এ জন্য একজন প্যারামেডিক এবং তাদের ১০ নারী কাজ করেন।
তিনি আর বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা এ কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তারা ওষুধ ছাড়াও, ঈদে নতুন শাড়ি-কাপড়, শীতবস্ত্র, চাউল ইত্যাদি সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। এতে তাদের অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। সবটা তারা সংকুলান করতে পারেন না। এজন্য তারা বিত্তবানদের কাছ থেকে সহায়তা নেন। গত ৬ বছরে ৯৪টি প্রতিষ্ঠান এখানে অনুদান দিয়েছে। যে কোন ব্যক্তি তার মাকে স্মরণ করে কিংবা মার জন্য করতে পারেনি তারাও এখানে সাহায্যে দিতে পারবেন।

শেয়ার